২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Amader Rajshahi

রামেক হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:২৫ অপরাহ্ণ | বিভাগ: lead
রামেক হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ
বিজ্ঞাপন

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। গত এক মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। আগস্টের শেষ দিকে হাসপাতালে যেখানে ৪৭–৪৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তা বেড়ে শতাধিক ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ (২২ সেপ্টেম্বর) ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৫ জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ১জন। বর্তমানে রামেক হাসপাতালে ১০৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ মারা যাওয়া আব্দুল করিম (৪৫) চাঁপাইনবাবগঞ্জের পোলাডাঙ্গা বটতলা এলাকার বাসিন্দা। পেশায় কৃষক করিম গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। হাসপাতালের নথিতে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে সন্দেহজনক ডেঙ্গু মায়োকার্ডাইটিসের কারণে হৃদ্স্পন্দনের জটিলতায় আকস্মিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এক মাসে দ্রুত বেড়েছে রোগীর চাপ: রামেক হাসপাতালের তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করে। ২৮ আগস্ট হাসপাতালে ৪৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর আগের ৪৮ ঘণ্টায় নতুন করে ২১ জন রোগী ভর্তি হন। একই সময়ে রাজশাহী নগরীতে এডিস মশার ব্রুটো সূচক বেড়ে ৬১ দশমিক ৩৩-এ পৌঁছায়, যা দুই মাস আগে মে মাসে ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে এডিস মশার ঘনত্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়। ৩১ আগস্ট রামেকে ডেঙ্গুতে আব্দুল হান্নান (৩৯) নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়। ওই সময় গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫ জন নতুন রোগী ভর্তি হন এবং ১৭ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৪৭ জন। মৃত হান্নান ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন। এরপর সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়। ১০ সেপ্টেম্বর রামেকে এক দিনে ২০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। ওই সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ছিল ৬৪–৬৯ জনের মধ্যে। একই দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত দুই তরুণের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়।
সেপ্টেম্বরে ৩৯৪ ভর্তি, বেড়েছে মৃত্যু: সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনে রামেক হাসপাতালে ৩৯৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ৩২৭ জন চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে অন্তত ছয়জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ১০৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃতদের মধ্যে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার রোগী ছিলেন। ৮ সেপ্টেম্বর ইমরুল কায়েস হৃদয় (২৬), ৯ সেপ্টেম্বর জিত সরকার (২২), ১৪ সেপ্টেম্বর হৃদয় (২৪), ১৫ সেপ্টেম্বর আসমা খাতুন (৩৫), ২০ সেপ্টেম্বর আনোয়ার মণ্ডল (৫২) ও সাথী রাণী (১৬) মারা যান। তাদের মধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও তানোরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। এর পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর মারা যান চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষক আব্দুল করিম। ফলে সেপ্টেম্বরের ২২ দিনেই রামেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত সাতজনে দাঁড়িয়েছে।
শুধু রাজশাহী নয়, আশপাশের জেলার রোগীর চাপও বেশি : ২০ সেপ্টেম্বর রামেকে চিকিৎসাধীন ১০৫ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে রাজশাহীর রোগী ছিলেন ৪৫ জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছিলেন ৩৭ জন। নওগাঁ ও নাটোরের সাতজন করে, পাবনার পাঁচজন এবং অন্যান্য জেলার চারজন ছিলেন। অর্থাৎ রামেক হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বড় একটি অংশ রাজশাহী ছাড়াও আশপাশের জেলাগুলোর বাসিন্দা। ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন করে আরও ২৯ জন ভর্তি হওয়ায় বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৭ জনে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি সুস্থ হয়ে অনেকেই ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
দেশে সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুর বড় চাপ: রাজশাহীর পাশাপাশি সারাদেশেও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ১৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই মারা গেছেন ৯৩ জন, যা চলতি বছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ। ওই সময় পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৩ হাজার ৬২৭ জন। ২১ সেপ্টেম্বরের আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৬৫৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ১৪৬ জন।
চিকিৎসকদের সতর্কতা: রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। তবে চলতি সেপ্টেম্বরে রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জন করে রোগী ভর্তি হচ্ছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা বাড়ানোর প্রস্তুতিও রয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম দেখা দিলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি কিংবা অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। বৃষ্টির পর বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম, টায়ার ও নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকলে তা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। নগরীর পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায়ও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রাজশাহীতে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে, রোগটি এখন শুধু মৌসুমি সতর্কতার বিষয় নয়; বরং আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ—তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন