মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যদি কোনো অর্জন হয়ে থাকে, সেটি বাংলাদেশের এবং দেশের মানুষের অর্জন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (২৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৬তম কার্যদিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সাফল্যের জন্য জাতীয় সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর তিনি এ কথা বলেন। এদিন বেলা ১১টায় শুরু হওয়া অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ আহমদ বীর বিক্রম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংসদের পক্ষ থেকে আমাকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। এর জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ এবং সংসদের সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আমাদের তাদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে। আমাদের দলের একটি স্লোগান হচ্ছে “বাংলাদেশ প্রথম”। আমি আমার অবস্থান থেকে দেশের এবং দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলার ও সেই স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। তারেক রহমান বলেন, এখানে আমাদের কারও ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নেই। যদি কোনো ভালো অর্জন হয়ে থাকে, সেটি বাংলাদেশের অর্জন। এই সফরের মাধ্যমে যদি দেশের মানুষের কোনো অর্জন হয়ে থাকে, সেটিও দেশের মানুষের অর্জন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদের সব সদস্য, বিশেষ করে বিরোধীদলীয় নেতা দেশের স্বার্থে কাজ করার জন্য আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। সে জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে বিরোধীদলীয় নেতাসহ সংসদের সব সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত : মালয়েশিয়া ও চীনে প্রথম বিদেশ সফর সফলভাবে শেষ করে দেশে ফিরে বাবা ও মায়ের কবর জিয়ারত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানের মাজার কমপ্লেক্সে গিয়ে বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন তিনি। পরে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে যোগ দিয়ে দাফতরিক কার্যক্রমে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পিতা ও মাতার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে পবিত্র ফাতিহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাত করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু এমপি, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের ‘অভূতপূর্ব সাফল্যের’ জন্য জাতীয় সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। শনিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৬তম কার্যদিবসে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি পাস হয়। এদিন বেলা ১১টায় শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ আহমদ বীর বিক্রম। অধিবেশনের শুরুতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের গত ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সাফল্যের জন্য ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে স্পিকার প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দিলে বিরোধীদলীয় নেতাসহ সংসদ সদস্যদের সমর্থনে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। এই সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে একাধিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেছেন। জনগণের কল্যাণে দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করে তিনি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। মন্ত্রী আরও বলেন, চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মালয়েশিয়া ও চীন তাদের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করবে। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানেও তারা উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তিনি বলেন, সেজন্য আমি অনুরোধ করছি, আজ আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে সংসদ থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব গ্রহণ করি। প্রস্তাবটি উত্থাপনের পর স্পিকার হাফিজ আহমদ বীর বিক্রম বলেন, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, সেটি সংসদের ধন্যবাদ প্রস্তাব হিসেবে গৃহীত হলো। এরপর এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিমানবন্দরে গণসংবর্ধনার প্রচলন থেকে সরে আসার মধ্য দিয়ে তিনি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তিÑপারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। সফরে দুই দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও রফতানি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ধন্যবাদ প্রস্তাব সমর্থন করে বলেন, আমরা সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চাই এবং বাস্তবায়ন করতে চাই। বিরোধী দল হিসেবে এ ক্ষেত্রে আমাদের যে দায়িত্ব, আমরা সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করবো। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া ও চীন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। তবে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় রফতানি ও জনশক্তি খাতকে আরও বহুমুখী করার সুযোগ রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী সফরে এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন। শফিকুর রহমান বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত মৌলিক চুক্তিগুলো সংসদে উপস্থাপন করা উচিত। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত এবং দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে বলেন, সংসদই যেন সব কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয় এবং সংসদকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। আলোচনা শেষে স্পিকার বলেন, ট্রেজারি বেঞ্চ ও বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এই সফরের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সাফল্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।-এফএনএস