প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ, রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ভর্তুকি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ, ফ্যামিলি কার্ড, হজের বিমানভাড়া কমানোসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান তিনি। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন। ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তার আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২২ সেপ্টেম্বর সকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে দেওয়া প্রাতরাশে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এরপর তিনি অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে অংশ নেবেন। সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মীদের সম্মানে দেওয়া সংবর্ধনায় যোগ দেবেন। ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক ও মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায়ও তিনি বক্তব্য দেবেন। সভাটিতে বৈশ্বিক বৈষম্য মোকাবিলায় প্রস্তাবিত ‘ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ইনইকুয়ালিটি’ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা। এরপর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। একই দিনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে অংশ নিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য ওই অনুষ্ঠানের বিষয় হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি থেকে টেকসই সমাধান, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির পথে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান। জাহেদ উর রহমান বলেন, বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আগের তুলনায় কমেছে। অথচ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘদিন বাংলাদেশে অবস্থান শুধু অর্থনৈতিক চাপই তৈরি করছে না, এর সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্ত। প্রধানমন্ত্রী এই বাস্তবতা নতুন করে বিশ্বসম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবেন। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সূচিতেও ২৪ সেপ্টেম্বর এই সভা নির্ধারিত রয়েছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সেখানে জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে। একই দিনে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি নিয়ে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং মেটাসহ আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১১টায় নিউইয়র্ক থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তার। দেশের গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, আগস্টে গ্যাস সরবরাহে যে বড় সংকট তৈরি হয়েছিল, সেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তিনি জানান, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। সেখান থেকে দৈনিক ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। উপদেষ্টা বলেন, এর আগে জ্বালানি খাতের পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতির জন্য দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, তার অর্থ এই নয় যে আগের সংকটের পর্যায়ে ফিরতেই দুই বছর লাগবে। সাম্প্রতিক সরবরাহ বিঘ্নের কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, সেটি অনেকটাই কেটে গেছে। দুই বছরের পরিকল্পনাটি মূলত আরও টেকসই ও উন্নত জ্বালানি পরিস্থিতি তৈরির জন্য। জাহেদ উর রহমান বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিতাস-২৮ উদ্বোধনের সময় জ্বালানি বিভাগও এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, নতুন কূপ খনন এবং বিদ্যমান কূপের ওয়ার্কওভার বা সংস্কারের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে জাতীয় গ্রিডে আরও গ্যাস যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক সিসমিক জরিপও পরিচালিত হচ্ছে। পুরনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কারের চেষ্টা সমানভাবে চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া টেকসই বিকল্প খুব সীমিত। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন তথ্য উপদেষ্টা। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। জাহেদ উর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কয়েক দিনে কিছুটা কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটসহ বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য, পরিবহন ও বীমা ব্যয় এবং এলএনজির উচ্চমূল্য সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। তিনি বলেন, জনগণের কষ্ট হবে— এটা আমরা অস্বীকার করছি না। সরকারের কাজ হবে সেই কষ্ট যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন ও নিত্যপণ্যের দামে যেন যৌক্তিক সীমার বাইরে না যায়, সেদিকে নজর রাখার কথা জানান তিনি। উপদেষ্টা বলেন, জ্বালানি খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ব্রিফিংয়ে উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, আগের দামে ডিজেল বিক্রির ক্ষেত্রে বিপিসির প্রতি লিটারে বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হচ্ছিল। লিটারপ্রতি ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির ফলে বার্ষিক ভর্তুকির চাপ কয়েক হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে সরকারের হিসাব। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত এবং একই অর্থ থেকে জ্বালানি ভর্তুকির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও ব্যয় করতে হয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতেও চলতি অর্থবছরে বিপুল ভর্তুকির প্রয়োজন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাজেটে নির্ধারিত অর্থ খুব দ্রুত ব্যয় হলে বছর শেষে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে। জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার জনপ্রিয়তা হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনও গণতান্ত্রিক সরকারই ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে কষ্ট দিয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজের ক্ষতি করতে চাইবে না। তার ভাষ্য, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন রয়েছে। ফলে জনগণের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করার রাজনৈতিক কারণ সরকারের নেই। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কষ্ট কমাতে ওএমএস, খাদ্যসহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাড়ানোর পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমকেও কাজে লাগানোর কথা জানান তিনি। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, একদিকে যখন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল ভর্তুকির প্রয়োজন হচ্ছে, তখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক। জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ এবং এ নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। তবে সরকারের একাধিক অগ্রাধিকার একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। তিনি বলেন, সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রায় এক দশকে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে নতুন করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে পুরনো স্কেলের বেতন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ কারণেই সরকার একবারে পুরো ব্যয় না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের পথে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্ন ছিল, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট দিয়ে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বাড়লে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত জ্বালানির দাম কেন বাড়ানো হচ্ছে। জবাবে উপদেষ্টা বলেন, দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট দিয়ে পেট্রোল-অকটেন উৎপাদন হলেও সেই পরিমাণ দেশের পুরো চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল থেকেও পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব পুরো ব্যবস্থার ওপর পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফর তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত কেন এবং সান ফ্রান্সিসকো যাওয়ার কোনও কর্মসূচি ছিল কিনা এ প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সফর কিছুটা দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে সান ফ্রান্সিসকোতে প্রধানমন্ত্রীর কোনও সরকারি কর্মসূচি ছিল না। পরবর্তী সময়ে সফর সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী দেশে দ্রুত ফিরে আসাকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি তুলনামূলক ছোট একটি প্রতিনিধিদল নিয়েও সফরে গেছেন। বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ড. ব্রেন্ডন নেলসনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ এবং এর আগে সম্ভাব্য কোনও চুক্তি সই হবে কিনা— এ নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে যতটুকু তথ্য দেওয়া হয়েছে, এর বাইরে বিস্তারিত কিছু তার কাছে নেই। তবে বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা চলার বিষয়টি আগে থেকেই প্রকাশিত তথ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের প্রকাশিত কর্মসূচিতেও ড. ব্রেন্ডন নেলসনের সাক্ষাৎ এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি সই অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মূল রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করতে প্রায় ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। একনেক ইতোমধ্যে প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপন এবং ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা ইএমইউ ট্রেন সংগ্রহ করা হবে। প্রকল্পের কাজ ২০৩১ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে ডিজেলনির্ভর ট্রেনের তুলনায় পরিচালন ব্যয় ও জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে প্রকল্পের হিসাবে উল্লেখ রয়েছে। জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যয়সাশ্রয়ী হবে। প্রথম প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে আরও রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর সুযোগ তৈরি হবে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা পুনরায় উৎপাদনে আনার চেষ্টা করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে নীলফামারীর দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলস এবং মাগুরা টেক্সটাইল মিলস পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। সরকারের অন্যতম সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, কার্ড বিতরণ ও সুবিধা দেওয়ার কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা হবে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার শনাক্ত করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে এমন পরিবার, হিজড়া ও বেদে জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং অর্ধ একর বা তার কম জমির মালিক পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবী, পেনশনভোগী, বড় ব্যবসায়ী এবং গাড়ি, এসি বা উল্লেখযোগ্য বিলাসবহুল সম্পদের মালিক পরিবার প্রাথমিকভাবে এই সুবিধার যোগ্য বিবেচিত হবে না বলে জানান তিনি। একটি পরিবারকে একটি ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার নীতি রাখা হয়েছে। সরকার এর আগে জানিয়েছিল, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, ২০২৭ সালের হজের জন্য বিমানভাড়া ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের তুলনায় তা ২৪ হাজার ৮৩০ টাকা কম। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে ধাপে ধাপে হজের বিমানভাড়া কমানো হয়েছে। সরকার হজের সামগ্রিক ব্যয় আরও সহনীয় করতে কাজ করছে। জাহেদ উর রহমান জানান, ধর্মীয় নেতা ও সেবাকর্মীদের রাষ্ট্রীয় সম্মানী প্রদানের কর্মসূচিও চলমান রয়েছে। ব্রিফিংয়ে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় সেবাকর্মীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে সম্মানী দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৬৮৩ জন ইমাম, ৪ হাজার ৩১২ জন মুয়াজ্জিন, ৩ হাজার ৭৮৪ জন খাদেম, ৫৮৬ জন পুরোহিত, ৪২২ জন অন্যান্য ধর্মীয় সেবাকর্মী, ৯৫ জন বৌদ্ধ অধ্যক্ষ এবং ৬৭ জন উপাধ্যক্ষ রয়েছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দেশের উপকূলসংলগ্ন প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার প্রয়োজনীয় সামুদ্রিক বেসলাইন তথ্য সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই কাজের মাধ্যমে সম্ভাব্য খনিজসম্পদসমৃদ্ধ এলাকা চিহ্নিত করার পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধরনের দূষণের বিস্তৃতি শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এই তথ্য ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যুব ও ক্রীড়া খাতের অগ্রগতি প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান জানান, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রতিভা দেখানো শিশু-কিশোরদের মধ্য থেকে নির্বাচিতদের নিয়ে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ৪০ দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালিত হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের আরও উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের দক্ষ ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তোলা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার এবং আসামি গ্রেপ্তার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলে ব্রিফিংয়ে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা।-
এফএনএস
