স্টাফ রিপোর্টার : চাঁপাইনবাবগঞ্জের পর ধারাবাহিকতায় রাজশাহীতেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আর মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাওয়াতে জরুরী সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে গত ১১ জুন শুক্রবার বিকেল পাঁচটা থেকে চলতি মাসের ১৭ জুন রাত্রি বারোটা পর্যন্ত কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। রাজশাহীবাসিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষার নিমিত্তে নেওয়া কঠোর লকডাউন নগরীর সর্বত্র পালিত হলেও নানা বাহানা দেখিয়ে শহরের উপকন্ঠ ছাড়াও উপজেলা পর্যায় থেকেও বিভিন্ন পন্থায় নগরীতে প্রবেশ করছে অসংখ্য মানুষ।
কোথাও কোথাও পুলিশি বাধায় ফিরে গেলেও কঠোর লকডাউনের মধ্যে সেই অনুপ্রবেশকে ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজশাহী নগর পুলিশ। ইজিবাইক, রিক্সা কিংবা ভ্যান না পেয়ে কেউ কেউ মাথায় ব্যাগ কিংবা বস্তা নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করছেন পায়ে হেঁটেই। কেউবা রিক্সা কিংবা ভ্যান রিজার্ভ করে নগরীতে প্রবেশের পর পুলিশি বাধায় আশ্রয় নিচ্ছেন মিথ্যা অজুহাতের। তবে, জেলা প্রশাসন কর্তৃক পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালত বিভিন্ন ব্যক্তিকে জরিমানাও করছেন লকডাউনের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বিনা কাজে নগরীর বিভিন্নস্থানে চলাফেরার জন্য।
তবুও যেনো পুরোদমে বন্ধ হচ্ছে না মানুষের আনাগোনা। অন্যদিকে, ৭ দিনের ঘোষিত কঠোর লকডাউন চলাকালেও নানা অজুহাতে শহরের রাস্তায় ঘুরছেন স্থানীয় মানুষ। করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আমলে নিচ্ছে না তারা। নানা অজুহাতে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন। ব্যক্তিগত গাড়ি অথবা রিকশা নিয়ে ঘুরছেন অনেকেই। অভিযোগ আছে, ডাক্তারের স্টিকার মেরে তাদের সন্তানেরাও গাড়ি নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নগরীর বিভিন্ন রাস্তাগুলো। অনেকে অলি-গলির মধ্যে থাকা দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন।
গতকাল শনিবারে নগরীর তালাইমারী ট্রাফিক মোড়, কাজলা বিনোদপুর এলাকা, নওদাপাড়া, বেলদারপাড়া, ছোটবনগ্রাম, শালবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফাঁকা রাস্তায় লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন, কেউ প্রাইভেট কার নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মুুখে পড়লে তারা নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন। কেউ বলছেন বাজার করতে বের হয়েছি, কেউ বলেন ওষুধ কিনতে, কেউ রুগী দেখতে, কেউ লাশ দেখতে আবার কেউ যাচ্ছে রুগীর খাবার দিতে।
নগরীর বিভিন্ন দোকানপাট বন্ধ থাকলেও রাস্তায় প্রাইভেট কার এবং ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা চলতে দেখা গেছে অসংখ্য। তবে মূলসড়ক দিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে পুলিশের বাধার মুখে পড়লে তারা বিকল্প অলি-গলির রাস্তা দিয়ে চলাচল করছেন। রাস্তায় গাড়ি চলাচল এবং লোকজন বাইরে বের হওয়া ঠেকাতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশের চেকপোস্ট রয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না যথার্থভাবে। যার কারণে দায়িত্বরত পুলিশরা পড়ছেন বিপাকে।
জানতে চাইলে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিহার জোনের এসি একরামুল হক বলেন, মূল সড়কে লোকজনের চলাচল এবং ছোটখাটো যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও পাড়া-মহল্লায় বের হওয়া মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। চেকপোস্ট এড়িয়ে তারা অলি-গলির রাস্তা দিয়ে এখান-ওখানে যাচ্ছেন। মুল রাস্তায় কাউকে ধরা হলে তারা নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন। কেউ বলে বাজার করতে বের হয়েছি, কেউ বলেন ওষুধ কিনতে, কেউ রুগী দেখতে, কেউ মরা দেখতে আবার কেউ যাচ্ছে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রুগীর খাবার দিতে ইত্যাদি ইত্যাদি।
জানতে চাইলে মতিহার থানার অফিসার ইনচার্জ এএসএম সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক স্যারের নির্দেশক্রমে কঠোর লকডাউনরে শুরু থেকেই তালাইমারী, বিনোদপুরসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে চেকপোষ্ট বসানো হয়েছে। মুল সড়ক দিয়ে শুধুমাত্র জরুরী পণ্যবাহী ট্রাক, এ্যাম্বুলেন্স, খাদ্যদ্রব্য সরবারাহের গাড়ী চলতে দেওয়া হচ্ছে। কিছু মানবিক বিষয় থাকে, সেটাও দেখতে হয়। কেউ হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলছেন, কেউ ওষুধ কেনার কথা বলছেন।
তবে কিছু মানুষ এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অযথাই রাস্তায় ঘুরাফেরা করছেন। মূল সড়কগুলো ছাড়া অলিগলিতেও দেখা গেছে জটলার দৃশ্যের বিষয়ে ওসি বলেন, অলিগলির রাস্তাগুলোতে মানুষ যাতে বের না হয় সেজন্য পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। তবে টহল পুলিশ চলে গেলে আবারও তারা বেরিয়ে জটলা করছে। এছাড়াও রাস্তায় বের হওয়ার জন্য মানুষ নানা কৌশল ব্যবহার করছেন।
কেউ গাড়ির সামনে জরুরী ওষুধ সরবরাহের ব্যানার লাগিয়ে বের হচ্ছেন। কেউ পকেটে প্রেসক্রিপশন নিয়ে বের হচ্ছেন। আমরা যখন আটকে জিজ্ঞেস করি, তারা বলেন ওষুধ কিনতে যাচ্ছি। তখন তো বলার কিছু থাকছে না। তবে আমাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হলে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। কাউকে ফিরিয়ে দিচ্ছি তারপরও মানুষ সচেতন হচ্ছেন না।
লকডাউনের প্রথমদিন শুক্রবার রাতে ঢাকা ও পাবনা থেকে নগরীতে প্রবেশ করা মানুষের ঢল থাকলেও এখন আর দূরদূরান্তের মানুষের তেমন কোন প্রবেশ লক্ষ্য করা না গেলেও; নগরীর উপকন্ঠ ও এর পার্শ্ববর্তী উপজেলা কিংবা পৌরসভা থেকে এখনও বহুমানুষের আগমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে নিয়মিতভাবেই। স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর অবস্থানকে ফাঁকি দিতে হাতে করে নিয়ে বেড় হচ্ছেন ডাক্তারের দেওয়া পূর্বেকার প্রেসক্রিসশন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পুরাতন মেডিকেল রির্পোটসহ বহন করছেন বিভিন্ন ধরনের টিফিনকারী।
হাসপাতালে যাবার জন্য যেহেতু প্রশাসনের বাধা নিষেধ নেই তাই উপরোক্ত পন্থাবলম্বন করে অনেকেই নগরীর বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে পৌছে যাচ্ছেন নিজেদের গন্তব্যস্থানে। মিথ্যা অজুহাত, পূর্বেকার মেডিকেল রিপোর্ট ও হাতে টিফিনকারী নিয়ে নগরীতে প্রবেশের এই পন্থাগুলো দায়িত্বরত প্রশাসনের লোকজন খুব একটা সিরিয়াসভাবে পর্যবেক্ষণ করছেনা বলেই এমন অনাকাঙ্খিত অনুপ্রবেশের ঘটনা চলমান রয়েছে বলে মন্তব্য নগরীর সচেতন মহলের।
এই ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে না পারলে নগরীর করোনা সংক্রমণের হার নিম্নমুখি করাটা অনেক কঠিণ হয়ে দাড়াবে বলেই বিশ্বাস অনেকের। একদিকে, বিভিন্ন এলাকা থেকে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা তো অন্যদিকে, পাড়ামহল্লার বিভিন্নস্থানে প্রায় সারাদিন দলবেঁধে গল্পগুজোব করার প্রবণতা এই কঠোর লকডাউনে বিপরীতমুখী পন্থাহিসেবে কাজ করছে বলে মন্তব্য স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের। নগরীর কোন কোন এলাকায় রাত্রি এগারোটা পর্যন্ত কিছু কিছু দোকান খোলা রাখারও প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। টহলরত পুলিশের গাড়িকে ম্যানেজ করে অনকেরাত্রি অবদি দোকান খুলে রেখে ব্যবসা করছে অনেকেই বলে অভিযোগও আছে স্থানীয়দের।
কঠোর লকডাউনের মধ্যেও গতকাল বিকেলে নওগাঁ ও মান্দা থেকে রাজশাহী নগরীতে প্রবেশ করেছে অনেক মানুষ। গতকাল শনিবার বিকেল ৫.৫০ মিনিটে এমনই বেশ কয়েকজনের দেখামেলে নগরীর প্রবেশদ্বার নওদাপাড়া আমচত্বরে। হাতে ও মাথায় ব্যাগ নিয়ে তারা প্রবেশ করছে নগরীতে। কেউ কেউ আবার ভ্যান কিংবা রিক্সা রিজার্ভ করে যাবার চেষ্টা করছেন নিজনিজ গন্তব্যস্থানে। রিক্সা, ভ্যান ও ইজিবাইকের চালকরা বেশি ভাড়ার আশায় ঐসকল বহিরাগতদের শিখিয়ে দিচ্ছেন নানা অজুহাতের কথা। পুলিশ ধরলে যেনো তারা বলেন, হাসপাতালে যাচ্ছি কিংবা হাসপাতালে অসুস্থ রোগী আছে তাকে খাবার দিতে যাচ্ছি। কিংবা উমুক ডাক্তার আজ রিপোর্ট নিয়ে দেখা করতে বলেছেন।
এমন নানা অজুহাতের কথাগুলো অনেক সময় ঐসকল চালকরাই মিখিয়ে দিচ্ছেন আগতদের। কিন্তু, সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। তাদের প্রশ্ন হলো এতো কঠোর লকডাউনের ভেতর বহিরাগতরা হাতে বড় বড় ব্যাগ ও বস্তা নিয়ে কিভাবে প্রবেশ করছে নগরীতে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (১০ জুন) রাতে সার্কিট হাউসে রাজশাহী মহানগরীতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সর্বাত্মক কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেন বিভাগীয় কমিশনার মোঃ হুমায়ুন কবীর। এরপর প্রজ্ঞাপন জারী করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (১১ জুন) বিকেল ৫টা থেকে ১৭ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকার সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল, দোকান, রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকবে।
তবে ওষুধ, কাঁচাবাজার, চিকিৎসাসেবা, মৃতদেহ দাফন ও সৎকারের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান এই লকডাউনের আওতাবহির্ভূত থাকবে। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই বিধিনিষেধ চলাকালে বাস, ট্রেনসহ কোনো ধরনের যানবাহন রাজশাহী মহানগরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং রাজশাহী মহানগর থেকে বের হতে পারবে না। তবে আমসহ কৃষিপণ্য, খাদ্যসামগ্রী পরিবহন, রোগী পরিবহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরী সেবাদানকারী পরিবহন এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।
জনসমাবেশ হয় এমন কোন অনুষ্ঠান যেমন, বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান, জন্মদিন, পিকনিক পার্টি, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও সব ধরনের পর্যটনস্থল, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে। এসব বিধিনিষেধ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।