এক ভূমিকম্পে কাঁপলো বাংলাদেশসহ ৬ দেশ
মিয়ানমারে পরপর দুটি ভূমিকম্প হয়েছে শুক্রবার (২৮ মার্চ) উৎপত্তিস্থলে প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৭। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছয়টি দেশে এর প্রভাব অনুভূত হয়েছে। এই ভূমিকম্পের প্রভাবে এদিন দুপুর ১২টা ২১ মিনিটে কেঁপে উঠে রাজধানীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারের সাগাইং থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তর–উত্তরপশ্চিমে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি। ইউএসজিএস জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে আঘাত হানা ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ, ভারত, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং চীনে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে পরপর দুটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর একটি ৭ দশমিক ৭ মাত্রার, অন্যটি ৬ দশমিক ৪ মাত্রার। মিয়ানমারে থেকে এর উৎপত্তি হয়। তবে থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য অঞ্চলে অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

মিয়ানমার : মিয়ানমারের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্পটি ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এবং এর গভীরতা ছিল ভূঅভ্যন্তরের ১০ কিলোমিটার (৬.২ মাইল) গভীরে। প্রথম বার আঘাত হানার পর আরেকটি শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ভূমিকম্পের তীব্রতায় রাস্তাঘাট ফাটল দেখা গেছে এবং ভবনের টুকরো খসে পড়েছে। ইরাবতী নদীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত একটি সেতু ভেঙে পড়েছে। ভয়াবহ ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে ৯১ বছরের পুরোনো আভা সেতু, যা পুরোনো সাগাইং সেতু নামেও পরিচিত। মিয়ানমারের ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা রয়টার্স সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, ‘আমরা হতাহত এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করার জন্য ইয়াঙ্গুনে অনুসন্ধান শুরু করেছি এবং ঘুরে দেখছি। এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’
থাইল্যান্ড : মিয়ানমারে উৎপন্ন ভূমিকম্প থাইল্যান্ডে আঘাত হানে। রাজধানী ব্যাংককে কম্পনে নির্মাণাধীন একটি ৩০ তলা সরকারি অফিস ভবন ধসে পড়েছে। সেখানে কর্মরত অন্তত ৪৩ জন শ্রমিক ভেতরে আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ ও মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। উত্তর ও মধ্য থাইল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায়ও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ প্রচারিত একটি ভিডিওতে ভবনগুলো কাঁপতে দেখা গেছে। আতঙ্কে লোকজন রাস্তায় ছোটাছুটি করেন। দুপুরে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত করে ব্যাংককে। ভূমিকম্পের প্রভাবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর ব্যাংককের ওই ভবনটি ধসে পড়ে।
বাংলাদেশ : আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রুবাইয়াত কবীর জানিয়েছেন, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৩। এর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের মান্দালয়। ঢাকা থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ৫৯৭ কিলোমিটার। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের প্রভাবে অনুভূত হয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির হয়নি।
চীন : চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক সেন্টার (সিইএনসি) জানিয়েছে, চীনের ইউনানে এর কম্পন অনুভূত হয়েছে। সিনহুয়া জানিয়েছে, এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৯।
ভারত : টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমিওলজি জানিয়েছে, মেঘালয়ের পূর্ব গারো পাহাড়ে ৪ মাত্রার ভূমিকম্পন অনুভূত হয়। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
লাওস : চীনের সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার এক প্রতিবেদেন বলা হয়, মিয়ানমারে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে লাওসের কয়েকটি শহরে কম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। লাও জাতীয় ভূমিকম্প তথ্যকেন্দ্রের তথ্যমতে, লাওসের উত্তর ও কেন্দ্রীয় অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হয়েছে। রাজধানী ভিয়েনতিয়েনেও কেঁপে উঠে। দেশটির কর্তৃপক্ষ সেখানকার বাসিন্দাদের সম্ভাব্য আফটারশকের জন্য প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করেছে।
মিয়ানমারে ধসে পড়ল ব্রিটিশ আমলের সেতু : শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে মিয়ানমারে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৭। শক্তিশালী এই কম্পনে দেশটির ইরাবতী নদীতে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ৯১ বছরের পুরনো একটি সেতু ধসে পড়েছে। মিয়ানমার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতী জানিয়েছে, শক্তিশালী ভূমিকম্পে মিয়ানমারের মান্ডালায়, নাইপিদো ও অন্যান্য কয়েকটি এলাকায় ভবন ধসে পড়ে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল সাগাইং শহরে। ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত ৯১ বছর বয়সি আভা সেতু ভেঙে পড়ে, যা পুরাতন সাগাইং সেতু নামেও পরিচিত। মান্ডালায় এবং সাগাইং অঞ্চলের মধ্যে ইরাবতী নদীতে ব্রিটিশরা এই সেতু নির্মাণ করেছিল। বার্তাসংস্থা এএফপি মিয়ামারের রাজধানী নাইপিদো থেকে জানিয়েছে, ভূমিকম্পের তীব্রতায় রাস্তাঘাট স্তব্ধ হয়ে গেছে এবং ভবন থেকে ছাদের টুকরো ভেঙে পড়েছে। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে মিয়ানমারে প্রথম ভূমিকম্প আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৭। আর ১টা ২ মিনিটে দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। সেটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৪। ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড, লাওস এবং চীনে। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছে। ব্যাংকক পোস্ট গতকাল শুক্রবার বিকেলে মিয়ানমারে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে এবং এর জেরে ব্যাংককে কম্পন অনুভূত হয়েছে। থাই আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, ব্যাংককসহ থাইল্যান্ডের অনেক জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। দেশটিতে নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবনও ধসে পড়েছে।
মিয়ানমার জান্তার সাহায্যের আবেদন : মিয়ানমারে গতকাল শুক্রবার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর দেশটির ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। পাশাপাশি বিরল ঘটনা হিসেবে ক্ষমতাসীন সরকার আন্তর্জাতিক সাহায্যেরও আবেদন জানিয়েছে। খবর এএফপির। মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলে শুক্রবার ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার পর ক্ষমতাসীন জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইংকে রাজধানী নেইপেডুর একটি হাসপাতালে আহতদের দেখতে যেতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন এএফপির প্রতিবেদক। এ সময় জান্তা সরকারের মুখপাত্র জাউ মিন তুন বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যতো দ্রুত সম্ভব মানবিক সহায়তা পাঠানোর আবেদন জানাচ্ছি।’ এদিকে, ভূমকম্পে হতাহতের সংখ্যা সম্পর্কে এখনো কোনো ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে, উল্লেখ করার মতো ঘটনা হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার সাহায্যের জন্য আবেদন করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ছাড়া এ ধরনের আবেদন সাধারণত দেশটি করে করে না। আর তাই সাহায্যের আবেদনের কারণে মনে করা হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা বেশ বড় মাপের হতে পারে। এক বিবৃতিতে জান্তা সরকার জানায় দেশের ছয়টি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এই অঞ্চলগুলো হলো- সাগাইং, মান্দালয়, মাগওয়ে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শান রাজ্য, নেইপেডু এবং বাগো। সরকারের মুখপাত্র জাউ মিন তুন আরও জানান, মান্দালয়, নেইপেডু ও সাগাইং অঞ্চলে আহতদের জন্য রক্ত দান করা খুব প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।-এফএনএস
