স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী নগরীর উপকন্ঠ পবা উপজেলার মাহিন্দ্রা এলাকায় সড়ক ও জনপথের (সওজ) সরকারি জায়গা দখল করে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। দেশের একটি গ্রুপ অব কোম্পানীর নামে এই দখলের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা। হরিয়ান ইউনিয়নের একজন মেম্বার বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেন। অর্থ আর ক্ষমতার দাপটে সড়কের দক্ষিণ অংশের প্রায় বিশ কাঠার মতো সড়ক বিভাগের সরকারি জায়গা দখল করে সেখানে স্থাপনা তৈরি করেছে তারা। শুধু স্থাপনাই নির্মাণ নয়, বেআইনীভাবে সরকারি জায়গা সীমানা দিয়ে ঘিরে বছরের পর বছর ভোগদখলের অভিযোগও উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। কোম্পানীর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘নাবা ডেইরী এন্ড ক্যাটল ফার্ম’ স্থাপন করে সরকারি জমি দখলের এই অভিযোগ উঠে নাবিল গ্রুপ’র বিরুদ্ধে।

স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০২০ সালে পবা উপজেলার মাহিন্দ্রা এলাকায় ক্রয়কৃত প্রায় ২১ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত নাবা ডেইরী এন্ড ক্যাটল ফার্ম নামের এই প্রতিষ্ঠানটি। এরমধ্যে হরিয়ান পূর্বপাড়ার বাসিন্দা গণি বারী নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৩ বিঘা জমি ক্রয় করে। আর অবশিষ্ট জমি ক্রয় করে অন্যদের কাছ থেকে। পবা উপজেলার হরিয়ান মৌজার ৭১৫ দাগের উপর প্রতিষ্ঠিত নাবা ডেইরী এন্ড ক্যাটল ফার্ম। যার জেএল নং ১৮৭। যাত্রাকালে ৩০০টি গবাদি পশু নিয়ে শুরু হয় ব্যবসা। দুই বছর পর ২০২২ সালে সেটির সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ৫৭০টিতে। আর ২০২৪ সালে সেটির সংখ্যা প্রায় হাজারের মতো। ক্রমান্বয়ে ব্যবসার পরিধি প্রসারিত হবার কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভেতর একের পর এক নির্মিত হয় নতুন নতুন স্থাপনা। নিজেদের ক্রয়কৃত নির্ধারিত জমিতে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে; ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি জায়গাতে নির্মাণ করে নতুন একটি স্থাপনা। কর্মরতরা জানান, প্রায় বিশ কাঠা জায়গাজুড়ে নির্মিত নতুন ঐ স্থাপনটির ভেতরে চলে উৎপাদিত পণ্যের প্যাকেজিং কার্যক্রমসহ অন্যান্য কাজ।

নিজেদের ক্রয়কৃত ২১ বিঘার নির্ধারিত সীমার গন্ডি পেরিয়ে সরকারি জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করার বিষয়টিকে স্থানীয়রা বলছেন, এটা তাদের ক্ষমতা আর অর্থের অপব্যবহার। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, এই গ্রুপ অব কোম্পানীর মালিক পক্ষের সাথে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র (রাজনৈতিক ও মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে বর্তমানে পলাতক) এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সাথে ছিল বেশ দহরম মহরম সম্পর্ক। যার কারণে, কোন প্রকার বাধাবিপত্তি ছাড়াই সরকারি জায়গা দখল করে এমন স্থাপনা নির্মাণের সাহস দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে, উভয়ের মধ্যে এই দহরম মহরম সম্পর্কের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথেই প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও, বেসরকারি ব্যাংক থেকে নাবিল গ্রুপের সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার ব্যাংক লোন (পর্যাপ্ত জামানত ব্যতীরেকে শুধু কাগজে কলমের বিপরীতে) নেবার বিষয়টি দেশের প্রথম শ্রেণির বিভিন্ন গণমাধ্যমে তুলেছিল ঝড়। বিশাল অংকের সেই ব্যাংক লোনের পেছনে কলকব্জা নাড়াচাড়া ও লোনের প্রাপ্তির বিষয়ে অলৌকীকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন লিটন বলেও খবরে প্রকাশ। যেটি ঐসময় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক টপিকস্ হিসেবেও স্থান করে নিয়েছেল বিভিন্ন গণমাধ্যমে। হয়তো সেই পেছনের শক্তি আর অর্থের দম্ভে সরকারি জায়গার বিশাল একটি অংশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণপূর্বক ভোগ করছে কোম্পানিটি বলে মন্তব্য স্থানীয়দের।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সড়ক ও জনপথ বিভাগের একজন প্রকৌশলী ও ভুমি শাখার (ভুমি সেকশন- সার্ভে) কর্মকর্তারা জানান, ২৪ ফিট রাস্তা নির্মাণের জন্য ১৯৯৫ সালে ঐ এলাকায় সরকার ভুমি অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীতে কাশিয়াডাঙ্গা থেকে আমচত্বর-খড়খড়ি-মাহিন্দ্রা হয়ে বেলপুকুরগামী ২৪ ফিটের রাস্তাটির কাজ সম্পন্ন হয় ২০০৯ সালে। রাস্তার উভয় পাশের্^ ৯০ ফিট করে মোট ১৮০ ফিট পর্যন্ত জায়গা সড়ক ও জনপথের (সওজ)। কেউ যদি সওজের জায়গা দখল করে কোন স্থাপনা নির্মাণ করে কিংবা দখল করে রাখে তাহলে দপ্তর থেকে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে, নিয়মানুযায়ী আমরা অভিযুক্ত দখলদারকে প্রথমে একটি-দুইটি নোটিশ প্রদান করবো। নোটিশ প্রাপ্তির পর পর তারা সেটি অপসারণ না করলে কিংবা দখলদারিত্ব থেকে সরে না গেলে ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রশাসনের লোকজন নিয়ে সওজ কর্তৃপক্ষ সেগুলো ভেঙ্গে দেবে। এমনটাই করা হচ্ছে শহরের উপকন্ঠ এলাকা বানেশ^রে বলেও জানান ঐ কর্মকর্তা। সরকারি জায়গা দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে নাবা ডেইরী এন্ড ক্যাটল ফার্মের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা সদুত্তর না দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক কথা বার্তায় লিপ্ত হন এবং এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আপনি প্রশাসন নাকি! আমরা দখল করে থাকলে সেটি এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসক দেখবে। তাদের কাছে গিয়ে খোজ নেন! মন্তব্যগুলো তিনি সেলফোনের মাধ্যমে বলেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রশ্নের টু দ্যা পয়েন্ট জানতে চাইলেও ওই কর্মকর্তা উত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
সওজ’র জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বলেন, এমনটা হলে আমরা আইনী ব্যবস্থা নেবো। বিষয়টি নিয়ে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। সে মোতাবেক রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হাকিম-এর কাছে ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে সত্যতা পেলে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। লীজ সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের আওতাভুক্ত এরিয়া অনেক বড়। এছাড়াও, লীজের জন্য আবেদনের সংখ্যাও কম না। তাই নিশ্চিত না হয়ে এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে নাবিল গ্রুপ অব কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম স্বপন বলেন, যদি সরকারি জায়গাতে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চিঠি দিলে আমরা সেটি অপসারণ করে ফেলেবো। তিনি এই প্রতিবেদককে আরো বলেন, ‘আমরা সওজ’র কাছে উক্ত জমি লীজ নেবার জন্য আবেদন করেছি।