রাজশাহী পুলিশ লাইনের উত্তপ্ত পরিবেশ শান্ত করলো সেনাবাহিনী
শাহানুর রহমান রানা : বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেমে গেলেও দেশজুড়ে চলছে চরম অস্থিরতা। চলমান এই অস্থিরতার সাথে যোগ হয়েছে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে আন্তঃকোন্দল। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার (৭ আগস্ট) সকাল থেকে রাজশাহী পুলিশ লাইনস ছিল উত্তপ্ত। দুইভাগে বিভক্ত হয়ে হট্টগোল আর মারামারির ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী পুলিশ লাইনস এর ভেতরে। পুলিশ সদস্য ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের কাছে একাধিক উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তা লাঞ্চনার স্বীকার হয়েছেন বলে জানান পুলিশ সদস্যরা। অবস্থা বেগতিক দেখে সেনাবাহিনীর সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
পুলিশ সদস্যদের দেয়া তথ্য মতে, আরএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) মোহাম্মদ হেমায়েতুল ইসলাম ও উপ-পুলিশ কমিশনার (শাহমখদুম) মোঃ নূর আলম সিদ্দিকীসহ আরো অনেক উর্দ্ধতন কর্মকর্তা লাঞ্চিত হয়েছেন রাজশাহী পুলিশ লাইনস এর ভেতরে বলে জানায় কর্মরতরা।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশে কর্মরতরা জানান, গতকাল বুধবার সকাল থেকেই পুলিশ লাইনস এর ভেতরের ও বাইরের পরিবেশ ছিল থমথমে। সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের উপর ক্ষিপ্ত ছিল জুনিয়র কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের একাংশ। ১১ দফা দাবির বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মাঝে কথাবার্তা চলমান ছিল। এছাড়াও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করার পেছনে পুলিশ কর্মকর্তাদের একাংশকে দোষারোপ করে পুলিশ সদস্যরা। নিজেদের দাবি ও আত্মরক্ষার বিষয় নিয়ে চলমান অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছিল পুলিশ লাইনস এর ভেতরে। এছাড়াও যেসকল উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তা ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন তাঁরা জুনিয়র কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য কর্তৃক শারিরীকভাবে লাঞ্চনা ও হেনস্তার স্বীকার হয়ে পুলিশ লাইনস ত্যাগ করেন বলে জানান পুলিশ সদস্যরা।
বাইরে থেকে দুর্বৃত্তরা যেনো পুলিশ লাইনস্ এর ভেতরে প্রবেশ করে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে সেজন্য সকাল থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ লাইনস এর প্রধান ফটকের সামনে পাহারা দিচ্ছিলেন। প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে দেখা গেছে হাতেগোনা কয়েকজন সেনাবাহিনীর সদস্য প্রধান ফটকের সামনে পাহারা দিচ্ছেন। পুলিশ লাইনস এর ভেতরের পরিবেশ ক্ষণেক্ষণে উত্তপ্ত হতে থাকলে বেলা ১২ টার পর অতিরিক্ত সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়েন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেকেই পুলিশ লাইনস এর বাইরে গিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ রাগান্বিত কন্ঠে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে গালিগালাজ করেন। কেউবা বলেন, ওমুক কর্মকর্তা পুলিশ লাইনের ভেতরে এসেছে, চল সবাই এখনি তাকে মারবো। এমন ধরনের উচ্চবাচ্য আর চেচামেচি শুরু হয় প্রধান ফটকের বাইরে ও ভেতরে। বেলা ১২:৩০ মিনিটে একজন কর্মকর্তাকে প্রধান ফটকের সামনে পেয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য তেড়ে যান মারতে। উপস্থিত কয়েকজন সেনাবাহিনী ও অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় তিনি কিছুটা রক্ষা পান। তবুও সেই সুযোগে বেশ কয়েকটি কিলঘুষি পড়ে ঐ পুলিশ কর্তার শরীরে। ঐমূহুর্তে বেশ কয়েকটি সেনাবাহিনীর গাড়ি পুলিশ লাইনস এর সামনে এসে পৌছালে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক সেনা সদস্য বলে ওঠেন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে গুলি করতে বাধ্য হবো। সেনাসদস্যের ওই কথা শোনামাত্রই বেশকয়েকজন পুলিশ সদস্য তেড়ে আসে সেনাসদস্যকে মারতে। চলে উভয়ের মধ্যে বাকবিতন্ডা। অবশেষে সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিয়ন্ত্রণে নেন পুলিশ লাইনস এর প্রধান ফটক। কিন্তু ভেতরে তখনো বিরাজ করছিল উত্তপ্ত পরিবেশ। সাংবাদিকদের প্রবেশে বাঁধানিষেধ থাকায় ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তেমন কোন স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া না গেলেও, যেসকল পুলিশ সদস্যরা বাইরে অবস্থান করছিলেন তারা জানান, উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাদের একাংশের উপর তাদের অভিমান এমন চরমে। তাদের অভিযোগ হলো, আন্দোলন চলমানবস্থায় পুলিশের অতিরিক্ত আক্রমণাত্বক অবস্থার কারণেই দেশের সকল থানা ও সাধারণ পুলিশ সদস্যরা আজ নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।
উল্লেখ্য, যে কোনো অরাজক পরিস্থিতি ও লুটতরাজ বন্ধে পুলিশকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। একই সঙ্গে চেইন অব কমান্ড বজায় রেখে পুলিশের প্রতিটি সদস্য যাতে উন্নত মনোবল ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও নির্দেশও দেন তিনি। গতকাল বুধবার (৭ আগস্ট) দুপুরে পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে রাষ্ট্রপতি তাকে এ নির্দেশ দেন।
রাজশাহী পুলিশ লাইনস- এর গতকাল ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলা ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য মোঃ সাইফউদ্দীন শাহীন, উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর), আরএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) মোহাম্মদ হেমায়েতুল ইসলাম, উপ-পুলিশ কমিশনার (শাহমখদুম) মোঃ নূর আলম সিদ্দিকীসহ আরো বেশ কয়েকজন উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন দিয়েও কোন রেসপন্স পাওয়া যায়নি। তবে বিকেল ৪:২৪ মিনিটে উপ-পুলিশ কমিশনার (শাহমখদুম) মোঃ নূর আলম সিদ্দিকী ফোন ব্যাক করেন। জানতে চাইলে তিনি সেদিনের ঐ অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, আমি পুলিশ লাইনস এর ভেতর প্রবেশ করা মাত্রই কয়েকজন যুবক আক্রোশমূলক ও ভীতিকর গতিবিধিতে আমার দিকে তেড়ে আসে। তারা কি পুলিশ সদস্য নাকি দুর্বৃত্ত, সেটা বোঝার কোন উপায় ছিলনা। পরে উপস্থিত অন্যান্য পুলিশ সদস্য ও সেনাবাহিনীর সহয়তায় আমি সেখান থেকে চলে আসি।
