নওগাঁয় স্বর্ণের দুল ও সম্পত্তির লোভে বড় বোনকে হত্যা, ভাই-ভাবিসহ ৫ জন গ্রেফতার
মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ : নওগাঁর ধামইরহাটে স্বর্ণের দুল, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও সম্পত্তির লোভে হালিমা বেগম (৬৫) নামে এক বৃদ্ধাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই ও তাঁর স্ত্রীসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের মাত্র একদিনের মধ্যে রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি হত্যায় ব্যবহৃত রশি ও ওড়না উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (২১ অক্টোবর) বেলা সোয়া ১১টায় নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন—ধামইরহাট উপজেলার ছিলিমপুর (তালবোনা) গ্রামের নিহতের ছোট ভাই মজনু রহমান (৫৬), তাঁর স্ত্রী হোসনে আরা (৪২), বস্তাবর গ্রামের রবিউল ইসলাম (৩৯) এবং ছিলিমপুর গ্রামের দুই ভাই হামিদুর রহমান (৫৫) ও মোশারফ হোসেন (৪৫)।
প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার জানান, গত ১৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে উপজেলার ছিলিমপুর (তালবোনা) গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে বাঁশঝাড়ের পাশে ধানখেতের আইলে হালিমা বেগমের মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় নিহতের এক কানের লতি কাটা এবং অন্য কানের লতি ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ওই দিনই ধামইরহাট থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করা হয়।
পরে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরিফুল ইসলাম ও ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিন্টু রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়।
তদন্তের একপর্যায়ে স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ১৯ অক্টোবর গভীর রাতে অভিযান শুরু করে পুলিশ। প্রথমে নিহতের ছোট ভাই মজনু রহমান ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রবিউল ইসলাম, হামিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ সুপার জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ঘটনার প্রায় পাঁচ দিন আগেই তাঁরা হালিমা বেগমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তদন্তে জানা যায়, নিঃসন্তান ও স্বামী পরিত্যক্ত হালিমা বেগম প্রায় ২০ বছর ধরে বাবার বসতভিটায় ছোট ভাই মজনুর বাড়ির পেছনে টিনের ছাপরাঘরে একা বসবাস করতেন। একটি গরু, তিনটি ছাগল, কয়েকটি হাঁস-মুরগি পালন এবং অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। নিজের কষ্টার্জিত জমানো টাকা বড় ভাইয়ের ছেলে রুবেলের কাছে রাখতেন হালিমা। কিন্তু ছোট ভাই মজনু ও তাঁর স্ত্রীকে টাকা দিতেন না। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে মাঝেমধ্যেই বিরোধ হতো।
এ ছাড়া মজনুর বাড়িতে অন্য অভিযুক্তদের যাতায়াত পছন্দ করতেন না হালিমা। অভিযুক্ত রবিউল ইসলাম এলাকায় মাদক বিক্রি করতে গেলে তিনি বাধা দিতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে একাধিকবার বাগ্বিতণ্ডা হয়। অন্যদিকে হামিদুর ও মোশারফের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও স্বর্ণের দুলের প্রতি লোভ, জমিজমা নিয়ে বিরোধ এবং মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ার জেরে ছোট ভাই মজনু ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরার পরিকল্পনায় পাঁচজন মিলে হালিমাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১১টার দিকে হামিদুর রহমান হালিমাকে ঘর থেকে ডেকে বের করেন। এ সময় অন্য অভিযুক্তরা তাঁর মুখ চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে খড়ের পালার পেছনে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর হাত রশি দিয়ে বেঁধে গলা চেপে ধরা হয়। পরে পরনের ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
হত্যার পর কানের স্বর্ণের দুল নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত হামিদুর হালিমার এক কানের লতি কেটে ফেলেন এবং অন্য কানের লতি ছিঁড়ে ফেলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
পরে মরদেহ গোপন করতে অভিযুক্তরা সেটি পুকুরপাড় দিয়ে বাঁশঝাড়ের পাশে নিয়ে ফেলে রাখেন। সেখানে হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। হত্যায় ব্যবহৃত ওড়নাটি নিহতের ছোট ভাই মজনু তাঁর চোখমুখের ওপর ঢেকে দেন। এরপর সবাই নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান।
পুলিশের দাবি, নিহতের কানের দুটি স্বর্ণের দুলের একটি মজনু এবং অন্যটি হামিদুর নিয়ে যান। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে অভিযান চালানোর ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও পাঁচজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নওগাঁ জেলায় যেকোনো অপরাধ দমন ও প্রতিরোধের পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করতে জেলা পুলিশ সর্বাত্মক তৎপর রয়েছে।’ পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
