গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ নয়, সমালোচনা গ্রহণই গণতন্ত্রের পরীক্ষা : তথ্যমন্ত্রী
সরকারের সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতাকেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি বলেছেন, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা বা কারও মুখ বন্ধ করা বর্তমান সরকারের নীতি নয়। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার স্বাধীনতা সবার রয়েছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও সংসদ টেলিভিশনে শুধু সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপিদের নয়, সংসদের বিরোধী দল এবং সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যও আনুপাতিক হারে প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। গত ১৭ বছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও সরকারের পক্ষে কথা বলা এবং সমালোচনা করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রতি ভিন্ন আচরণের অভিযোগ ছিলÑ এমন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করা আসলে একটি মানসিকতার বিষয়। এটা শুধু কোনো সিস্টেম বা কাঠামোর বিষয় নয়। আপনি আপনার বিরুদ্ধে সংবাদ বা সমালোচনা গ্রহণ করতে পারবেন কি নাÑ এটাই গণতান্ত্রিক মানসিকতার বড় পরীক্ষা। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতার ঘাটতি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, সরকার যেহেতু কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দিয়েছে, তাই সেই চ্যানেলকে সরকারের পক্ষে কথা বলতে হবে। বর্তমান সরকারের অবস্থান ভিন্ন দাবি করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, গত ছয় মাসে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই আমি বলেছিÑ আমরা কাউকে নিয়ন্ত্রণ করবো না, কারও মুখ বন্ধ করবো না। গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ উল্লেখ করে পার্থ বলেন, গণমাধ্যম রয়েছে বলেই সরকার জবাবদিহির মধ্যে থাকে। সরকার ও গণমাধ্যমÑ উভয় পক্ষকেই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবে দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের আহ্বানও জানান তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর সরকার এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দায়িত্ব পেয়েছে, যেখানে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত কঠিন একটি সময়। তথ্যমন্ত্রী বলেন, আপনারা অবশ্যই সরকারের সমালোচনা করবেন। সেটি বস্তুনিষ্ঠভাবে করবেন। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা দরকার। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত বিচ্ছিন্ন অপরাধের সংবাদ উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। পার্থ বলেন, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন ও ৩৬ হাজার ওয়ার্ড রয়েছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ছোটখাটো অপরাধ ঘটবে। কিন্তু সব ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলে যেন পুরো দেশ অচল হয়ে পড়েছে, তাহলে মানুষের মধ্যে বাস্তবতার তুলনায় বড় নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে দেশের গণমাধ্যম অতীতের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে বলেও দাবি করেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, গত ছয় মাসে গোয়েন্দা সংস্থার কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমে ফোন করে সংবাদ বন্ধ করতে বলেছেন কি না, কিংবা সরকারের মদদে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কি নাÑ এসব বিষয়ও মূল্যায়নের মধ্যে আনা যেতে পারে। সরকারের ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোও সংবাদে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভালো কাজের স্বীকৃতি পেলে সরকার আরও ভালো কাজ করতে উৎসাহিত হবে। ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, অবশ্যই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার স্বাধীনতা সকলের রয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অব্যাহত থাকবে। তবে সরকার ও রাষ্ট্রকে আলাদা করে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করা যাবে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়Ñ এমন কার্যক্রম বা রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো বিষয় প্রচারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল হতে হবে। এদিকে, সংবাদ সম্মেলনে নতুন তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থকে প্রশ্ন করার সময় এক সাংবাদিক তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এর জবাবে সাংবাদিক ‘প্রফেশনাল ওয়েতে’ প্রশ্ন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন নতুন তথ্যমন্ত্রী। সাংবাদিকের প্রশ্নটি ছিল, পলাতক শেখ হাসিনাকে ফেরত পেতে ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাদির খুনিদেরও ফেরত দেওয়ার জন্য বলেছে। কোনো আপডেট আছে কি না? কবে নাগাদ ফেরত পাচ্ছেন আপনার আত্মীয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে? এর জবাবে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, আমি আশা করছিলাম আপনার প্রশ্নটা আরও প্রফেশনাল হবে। আমি এখানে বসা তথ্যমন্ত্রী হিসেবে, কারও আত্মীয় হিসেবে নয়। আশা করি আরও প্রফেশনাল ওয়েতে প্রশ্ন করবেন। একই প্রশ্নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, জবাব দেওয়ার আগে আমি একটু যোগ করি, উনি (পার্থ) বহু বছর ধরে কার সঙ্গে ছিলেন? উনি কী করেছেন? এটা পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে। এরপর তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে আছেনÑ এটা আমরা জানি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ফেরত আনার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত ও অনুরোধ ভারতের কাছে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জানা মতে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি ভারতীয় পক্ষ আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করতে পারে। আমার মনে হয়, রাজনৈতিকভাবে সরাসরি সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টি যদি আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি তার জন্য খুব একটা সুখবর হবে না। আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, শুধু শেখ হাসিনা নন, বাংলাদেশের যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং যারা বিদেশে অবস্থান করছেন, আমরা তাদের সবাইকে দেশে ফেরত চাই। এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিলের ঘটনাকে সরকারের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা নিরাপত্তা সংকটের আশঙ্কা থাকলে অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিল হতে পারে। তবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার কোনো নীতিগত অবস্থান সরকারের নেই। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে বাধার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় কিছু আলেম-ওলামার আপত্তির পর অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছেÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, বাংলাদেশে ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরেই কোনো কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কিছু গোষ্ঠীর আপত্তি দেখা গেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে কীভাবে বসবাস করবে, সেটি সমাজই নির্ধারণ করবে। কিছু মানুষ মাঝে মাঝে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তবে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রশ্ন করা হয়Ñ সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পুলিশ কনসার্টের অনুমতি বাতিল করেছে। সে ক্ষেত্রে সরকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতা করল কি না? জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো কনসার্ট বাতিল হলেই তার অর্থ এই নয় যে সরকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করছে। তিনি বলেন, হয়তো সেখানে নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো বিষয় ছিল। অন্য কারণও থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বললে সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে। এ সময় তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন কারণেই কোনো অনুষ্ঠান বাতিল হতে পারে। সব ক্ষেত্রে কোনো গোষ্ঠীর আপত্তিই একমাত্র কারণÑ এভাবে দেখার সুযোগ নেই। দেশে এখনও অনেক বড় কনসার্ট এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা নিরাপত্তা সংকটের আশঙ্কা থাকলে নিরাপত্তার স্বার্থে অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে। এটাকে ধারাবাহিক ঘটনা বলব না। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ধরনের ঘটনা তো একাধিকবার এবং ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। জবাবে তথ্য উপদেষ্টা জানান, তিনি এটাকে ধারাবাহিক বা লাগাতার ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এ ধরনের যত ঘটনা ঘটেছিল, তার তুলনায় বর্তমান সরকারের সময়ে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আমি বলব, নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। আমি বলছি না যে এখন একটি ঘটনাও ঘটছে না। কিছু ঘটনা এখনও ঘটছে। তিনি বলেন, দেড় থেকে দুই বছর ধরে যখন কিছু গোষ্ঠী এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে এসেছে, তখন পরিস্থিতি রাতারাতি পুরোপুরি বদলে যাবেÑ এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং যতটুকু উন্নতি হয়েছে, আমি সেটিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখি। বাকি সমস্যাগুলোও ধীরে ধীরে সমাধান হবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চান প্রধানমন্ত্রী। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের সঙ্গেও সম্পৃক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, এ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার একাধিক বৈঠক হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো, সংস্কৃতিচর্চাকে আরও বিস্তৃত করা এবং সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আগ্রহী ও মনোযোগী।-এফএনএস
