মঙ্গলবার

২৫শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

১১ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

এবারো চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

Paris
Update : মঙ্গলবার, ৪ জুন, ২০২৪

গত বছর ডেঙ্গুতে দেশে রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যু হয়েছে। এ বছর বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের চেয়ে খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। গত বছর দেশে ডেঙ্গু রোগে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১ হাজার ৭০৫ জন। ইনজেকশনযোগ্য স্যালাইনের অভাবের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছিল। তবে এ বছর যাতে ফের স্যালাইন সংকট না হয় সেজন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বৈঠক করেছে। ওষুধটির স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালে ইনজেকশনযোগ্য স্যালাইনের মজুত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বারের তুলনায় আরও খারাপ হবে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে এ বছর ঢাকার বাইরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ঢাকার চেয়ে বেশি খারাপ হবে। কারণ গত বছর সারা দেশে এডিস মশা ছড়িয়ে গেছে। মিডিয়া ও বিশেষজ্ঞদের চাপে ঢাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ঢাকার বাইরে তো কিছুই করা হয় না। তিনি আরও বলেন, এ বছরও মৌসুমের আগে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। মশার বংশবিস্তারের উৎসে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। তবে ঢাকার বাইরে উপজেলা ও জেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে যেন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা করা যায় সে প্রস্তুতি রাখতে হবে। কারণ ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো দেরিতে চিকিৎসা শুরু করা। ঢাকার বাইরের রোগীরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ছোটাছুটি করতে গিয়ে বেশি খারাপ হয়ে যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর ডেঙ্গুজ¦রে রেকর্ড পরিমাণ রোগী আক্রান্ত হয়েছে। ২০০০ সালে দেশে প্রথম ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। সে বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ৯৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এরপরে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু প্রকোপ আকার ধারণ করে। এ সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখেরও বেশি মানুষ, মারা গিয়েছিলেন ১৭৯ জন। এরপরে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। গত বছর দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের ২২ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় ও মারা যায়। এদিকে রাজধানীতে মৌসুম শুরুর আগেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। ঢাকার দুই সিটির ১৮টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট মানদণ্ড ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৭ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার আওতাধীন জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অধীনে এই প্রাক-বর্ষা জরিপ চালানো হয়। এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ নামে পরিচিত। এই মানদণ্ডে লার্ভার ঘনত্ব ২০ শতাংশের বেশি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে মনে করা হয়। জরিপে দেখা গেছে, দুই সিটির ৯৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর বেশি অর্থাৎ এসব এলাকার ১০০টির মধ্যে ২০টির বেশি পাত্রে মশা বা লার্ভা পাওয়া গেছে। এই এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১২, ১৩, ২০, ৩৬, ৩১, ৩২, ১৭, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৪, ১৩, ৫২, ৫৪, ১৬, ৩, ৫, ১৫, ১৭, ২৩ নম্বর ওয়ার্ড ঝুঁকিতে রয়েছে। উত্তর সিটিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ১২ নম্বর ওয়ার্ড, যেখানে ব্রুটো ইনডেক্স ৪৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এরপরের অবস্থানে রয়েছে ১৩ নম্বর ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড, এগুলোতে ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৪০ শতাংশ। ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ৩১ নম্বর ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে ৩০ শতাংশ, ১৭ নম্বর ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে। এরপর ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ৫২ নম্বর ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে। এছাড়াও ৩ নম্বর, ৫ নম্বর, ১৫ নম্বর, ১৭ নম্বর এবং ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৩০ শতাংশ ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, মশা নিধনের ওষুধ সহজপ্রাপ্য করতে হবে। মানুষ দোকানে গিয়ে যেমন প্যারাসিটামল কেনেন, মশার ওষুধের ক্ষেত্রেও তেমন বিষয়টি সহজ করতে হবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আরও বলেন, গত বছর কেনা মশকনিধনে বিটিআই তাঁরা ব্যবহার করতে পারেননি। বিটিআই সরবরাহের ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছিল। এ বছর তাঁরা সরাসরি বিদেশ থেকে বিটিআই কিনবেন। ডিএনসিসি মেয়র বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে জনগণকে সচেতন করতে ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিবিদ, ইমাম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবাইকে নিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে করণীয় সম্পর্কে মতবিনিময় সভা এবং র‌্যালি করা হয়েছে। ডিএনসিসির পক্ষ থেকে ওষুধ প্রয়োগ করা, পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা জরুরি। ছাদে, বারান্দায়, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, মাটির পাত্র, খাবারের প্যাকেট, অব্যবহৃত কমোড এগুলোতে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৮৪৯ জনের। শুধু ২০২৩ সালেই মারা গেছেন ১ হাজার ৭০৫ জন। এ বছর প্রথম কয়েক মাসে আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি। মশা জরিপে মশার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা গেছে। তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব গত বছরের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে নজরদারি বাড়ানো, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, ডেঙ্গু রোগ ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা হালনাগাদ করা, মৃত্যু পর্যালোচনা করা, ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি নির্ধারণ উল্লেখযোগ্য। এ ব্যাপারে ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে বলে মনে হচ্ছে। ডেঙ্গু এখন আর শহরের রোগ নেই, সারা দেশেই এটি ছড়িয়ে গেছে। সবাই তো জানি এডিস শত্রু মশা। তাই মশা নিধন করতে হবে, নিজেকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে ভয় পাওয়া যাবে না, প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে তীব্র পেটে ব্যথা, বমি, শ্বাস নিতে অসুবিধা এবং নাক, মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের একার পক্ষে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। নাগরিকদের মশা নিধনে সক্রিয় হতে হবে। হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মানুষকে সচেতন করার কাজ করতে হবে, মানুষকে বোঝাতে হবে।-এফএনএস

 


আরোও অন্যান্য খবর
Paris