এফএনএস : দাওয়াত শব্দের অর্থ হলো আহ্বান। ইসলামি পরিভাষায় মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করাতে দাওয়াত বলে। আর যিনি এই মহতি কাজ করেন, তাঁকে দাঈ বলে। নিম্নে দাঈর আবশ্যক গুণাবলি তুলে ধরা হলো; ইলম থাকা : ইলম শব্দের অর্থ হলো জ্ঞান। আমাদের দেশের পরিভাষায় ইলম বলতে ইসলামি জ্ঞান বোঝায়। দাওয়াত হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক। কারণ দাঈ যে বিষয়ে দাওয়াত দেবে, সে বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞান থাকা উচিত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি বলুন, এটাই আমার পথ, আল্লাহর প্রতি মানুষকে আমি আহ্বান করি জেনে-বুঝে।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১০৮) এ জন্য একজন দাঈর ইসলামি জ্ঞান অন্বেষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এবং কোরআন হাদিসের বিশুদ্ধ বাণীগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত। ইখলাস : ইখলাসহীন আমল মূল্যহীন। কোনো আমলেই লোক দেখানো, খ্যাতি লাভ, প্রশংসা কুড়ানোর মনোবৃত্তি তার উদ্দেশ্য হওয়া কাম্য নয়। দাঈ মানুষকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে হবে, একমাত্র আল্লাহর জন্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে এবং সালাত কায়েম করতে ও জাকাত প্রদান করতে; এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম।’ (সুরা বায়্যিনাহ, আয়াত : ৫) তাই একজন দাঈর কর্তব্য হচ্ছে দাওয়াত কর্মে আল্লাহর একনিষ্ঠ হওয়া। সত্যবাদী হওয়া : আল্লাহর পথের দাঈকে অবশ্যই সত্যবাদী হতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১১৯) ধৈর্য ও সহনশীলতা : একজন সফল দাঈ হতে হলে অবশ্যই পরম সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল হবে। যেমন ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। দাওয়াতি ময়দানে তাকে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো বিচলিত হননি বরং ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন। অতএব তাড়াহুড়া ও কঠোর নীতি গ্রহণ করা হতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে কঠিনভাবে। দৃঢ়তা থাকা : যেকোনো পরিস্থিতিতে ঈমানের ওপর অবিচল থাকাও দাঈর অন্যতম গুণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’ অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী, তাতে তারা স্থায়ীভাবে থাকবে, তারা যা আমল করত তার পুরস্কারস্বরূপ।’ (সুরা আহকাফ, আয়াত : ১৩-১৪) সদাচারী হওয়া : এটাও দাঈর আবশ্যক গুণ, যা নবীজি (সা.)-এর মাঝে ছিল। এ ব্যাপারে নবীজিকে উদ্দেশ্য করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন, পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন এবং কাজে ও কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করুন, আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আল ইমরান, আয়াত : ১৫৯) নিজের আমলেও গুরুত্ব দেওয়া : দাঈর জন্য বাঞ্ছনীয় এবং আবশ্যক গুণাবলির মধ্যে এটিও একটি যে লোকদের যে বিষয়ের প্রতি দাওয়াত দেবে নিজের মধ্যে আগে তা বাস্তবায়ন করবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা যা করো না তা তোমরা বলো কেন? তোমরা যা করো না তোমাদের তা বলা আল্লাহর নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক।’ (সুরা : সফ, আয়াত : ২-৩) শয়তানের প্ররোচনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া : শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে মুহূর্তে মানুষের সারা জীবনের নেক-আমল মূলহীন করে দেয়। তাই শয়তানের প্ররোচনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া উচিত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার প্ররোচনা অনুভব কর, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৬) ক্ষমাশীলতা : একজন দাঈ দাওয়াতের কাজ করতে গিয়ে অনেক আচরণের শিকার হতে পারে, অনেক পরিস্থিতির শিকার হতে পারে। কারো দ্বারা এ রকম কোনো পরিস্থিতিতে পড়লে দাঈর উচিত আল্লাহর জন্য তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, আপনি ক্ষমাশীলতার নীতি অবলম্বন করুন, লোকদের সৎকাজের নির্দেশ দিন। (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৯৯) মূর্খদের এড়িয়ে চলা : দাওয়াতের কাজ করার ক্ষেত্রে অনেক সময় সঠিক কোরআন-হাদিস দিয়ে দাওয়াত দেওয়ার পরও অনেক মূর্খরা তা মেনে নিতে চায় না, উপরন্তু ফেতনা করার চেষ্টা করে, নবীজি (সা.)-এর যুগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, মূর্খদের এড়িয়ে চলতে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং মূর্খদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৯৯) হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, একবার আমি রাসুল (সা.) -এর সঙ্গে হাঁটছিলাম। তখন তাঁর গায়ে একখানা গাঢ় পাড়যুক্ত নাজরানি চাদর ছিল। এক বেদুঈন তাঁকে পেয়ে চাদরখানা ধরে খুব জোরে টান দিল। আমি নবী (সা.)-এর কাঁধের ওপর তাকিয়ে দেখলাম যে জোরে চাদরখানা টানার কারণে তাঁর কাঁধে চাদরের পাড়ের দাগ বসে গেছে। তারপর বেদুঈন বলল, হে মুহাম্মদ, তোমার কাছে আল্লাহর দেওয়া যে সম্পদ আছে, তা থেকে আমাকে দেওয়ার আদেশ করো। তখন নবী (সা.) তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন এবং তাকে কিছু দান করার আদেশ করলেন। (বুখারি, হাদিস : ৬০৮৮) ধৈর্যশীল হওয়া : পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, অতএব আপনি ধৈর্যধারণ করুন, যেমন ধৈর্যধারণ করেছিল সুদৃঢ় সংকল্পের অধিকারী রাসুলগণ। (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ৩৫)। (মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা)