শাহানুর রহমান রানা
রাজশাহী মহানগরীর সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ব্যক্তি মালিকানাধীন বাসাবাড়ি ও মার্কেটের দেয়াল, রাস্তার আইল্যান্ড, ঢোপ দোকান, বিদ্যুতের পোলসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে এখন শুধু পোস্টার আর পোস্টারের ছড়াছড়ি। পোস্টার লাগানোর ক্ষেত্রে খোদ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও তা মানছেনা প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে করে চরম বিপাকে পড়েছে রাসিক কর্তৃপক্ষ। পোস্টারগুলোর জন্য একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে নগরীর সৌন্দর্য, তো অন্যদিকে, রাসিক হারাচ্ছে বিপুল পরিমান রাজস্ব। রাসিকের উপ-ট্যাক্সেশন কর্মকর্তা (বাণিজ্য) এ.কে.এম আবু সাকের বলেন, বিষয়টি নিয়ে খোদ রাসিক কর্তৃপক্ষও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধ করার পরেও রাতের আধারে তারা নগরীর সড়ক সংলগ্ন রাস্তার পাশে অবস্থি দেওয়ালে সাঁটিয়ে দিচ্ছে পোস্টার। এতে করে ঐ দেওয়ালগুলোর রং যেমন হচ্ছে, অন্যদিকে, শ্রীহিন হয়ে পড়ছে রাজশাহী মহানগরীর সৌন্দর্য্য।
নগরীর পরিবেশের সৌন্দর্যকে বিনষ্টের হাত থেকে রক্ষার করার অভিপ্রায়ে গত ১৩ ডিসেম্বর ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ও যত্রতত্র না লাগানোর জন্য রাসিক কর্তৃপক্ষ একটি নির্দেশনামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কিন্তু এরপরেও থেমে নেই অনুমতি বিহীন নগরীর সড়ক সংলগ্ন দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের পোস্টার লাগানোর কার্যক্রম। যার কারনে, একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে নগরীর বাহ্যিক সোন্দর্য্য, ঠিক তেমনিভাবে রাসিকের রাজস্ব শাখাও বঞ্চিত হচ্ছে মোটা অংকের রাজস্ব থেকে। উক্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, ‘দেয়ালে লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ অনুযায়ী স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিত যত্রতত্র দেওয়ালে লিখন, ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন লাগানো আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। ইতিমধ্যে যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন লাগিয়েছে, তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে তা অপসারণের অনুরোধ করা হলো। ভবিষ্যতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিত যত্রতত্র ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন লাগানো হলে জরিমানা বা কারাদন্ড হতে পারে। উক্ত বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছিল যে, নগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে পাশের দেয়ালে, ভবনে, গাছে, বৈদ্যুতিক খুঁটিতে, সড়ক দ্বীপ ও বিভাজনে, দৃষ্টিনন্দন সড়কবাতির খুঁটিতে সহ বিভিন্ন স্থাপনায় রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়ী সংগঠণসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টারসমূহ ও ব্যক্তি কর্তৃক এই সকল পোস্টার লাগানোর কারনে পরিচ্ছন্ন রাজশাহী মহানগরীর সৌন্দর্য্যহানি হচ্ছে। এতো কিছুর পরেও শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংলগ্ন দেওয়াল, আইল্যান্ড, বৈদ্যুতিক ল্যাম্পপোস্ট, ছাড়াও বাসাবাড়ির গেটে ও ডাস্টবিনের দেওয়াল, ছোট ও মাঝারি আকৃতির ঠোপ দোকানে হাজার হাজার পোস্টার লাগানো আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো সেগুলো অপসারণ করেননি। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুড়ে চোখে পড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হারানো ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, ফাস্টফুডসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান বিষয়ক পোস্টার। নগরীর সরকারি অফিসের সীমানা প্রাচীরেই ঐসকল পোস্টারের সংখ্যাই বেশি।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে, রাসিকে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক ইস্যুতে আমরা তেমনভাবে নাক ঘলাতে পারিনা। তবে, বিষয়গুলো ওভারকাম করে সকলের জন্য এক নিয়ম না করলে এই ধরনের জটিলতা থেকে বেড় হওয়া খুব কঠিন হয়ে দাড়াবে। এছাড়াও, রাসিকের অনুমতি না নিয়ে যত্রতত্র হাজার হাজার পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনের ব্যবহারে রাসিকের রাজস্ব শাখা প্রতিবছরই বঞ্চিত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব থেকে। বিষয়গুলো নিয়ে আমরাও কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে আছি। নগরীর রেলগেট সংলগ্ন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কার্যালয়ের সীমানা প্রাচীর ছাড়াও রাজশাহী সরকারি কলেজ এর আশেপাশে, জাদুঘর সংলগ্ন এলাকা, ম্যাচফ্যাক্টরি থেকে শাহমখদুম থানা হয়ে নওদাপাড়া পর্যন্ত, সাগরপাড়া বটতলা থেকে সাধুর মোড় হয়ে মোন্নাফের মোড়, বর্ণালী মোড় এলাকা, কাদিরগঞ্জ এলাকা, মালোপাড়া, শালবাগান থেকে শুরু করে বিমান মোড় পর্যন্ত এলাকাগুলো ছাড়াও নগরীর অধিকাংশ এলাকার সড়ক সংলগ্ন বিভিন্ন দেওয়ালে পোস্টারের উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়াও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ের (আরডিএ) প্রধান ফটক ছাড়াও সামনের সীমানা প্রাচীরজুড়ে সাঁটানো রয়েছে অসংখ্য পোস্টার।


রাসিকের উপ-ট্যাক্সেশন কর্মকর্তা (বাণিজ্য) এ.কে.এম আবু সাকের দৈনিক আমাদের রাজশাহীকে বলেন, গত ১৯ ডিসেম্বর এই বিষয় নিয়ে রাসিক কার্যালয়ে একটি মিটিং হয়েছে। কিভাবে এই সমস্যা থেকে নগরীর পরিচ্ছন্নতাকে রক্ষা করা যায় সেটি নিয়ে একটি আলোচনা সভা হয়েছে। নগরীর সৌন্দর্যকে বিনষ্টের হাত থেকে রক্ষার করার জন্য সড়ক সংলগ্ন বিভিন্ন দেয়ালসহ যত্রতত্র পোস্টার লাগানো থেকে সকলেই যেনো নিরুৎসাহিত হয় যে জন্য ইতিমধ্যেই আমরা বিশেষ একটি প্যাকেজ হাতে নিয়েছি। যে কোন বাণিজ্যিক ও সেবাদানকারি প্রতিষ্ঠানসহ অন্যরাও মাত্র পাঁচশত টাকা ব্যয়ে পনের দিনব্যপি শহরের নির্দিষ্ট স্থানে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য ব্যানার ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু দেয়ালে পোস্টার সাটিয়ে দেয়াল তথা শহরের সৌন্দর্যের হানি ঘটাতে পারবেন না। তিনি আরো বলেন, আমরা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ডোর টু ডোর গিয়ে এই বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকার জন্য বলে আসছি। এছাড়াও ইতিমধ্যে যারা বিভিন্ন দেয়ালে পোস্টার সাটিয়েছেন, সেগুলো অপসারণের প্রস্তুতি চলছে। প্রতিষ্ঠানের প্রচারের স্বার্থে রাসিক থেকে এখন শুধুমাত্র ব্যানার ও ফেস্টুন ঝুঁলানোর অনুমতি দেওয়া হবে। কোন প্রকার পোস্টার ও লিফলেট দেয়াল কিংবা অন্যকোথাও লাগানোর অনুমতি রাসিক আর দেবে না। যদি কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি নিজ খরচে নিজেদের লাগানো পোস্টারগুলো অপসারণ না করেন, তবে তাদরে বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবারও নিয়ম আছে। কিন্তু রাসিক কার্যালয়ে এই মুহূর্তে কোন ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় আমরা সরেজমিনে গিয়ে জরিমানা বা অন্যকোন আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছিনা। তিনি আরো জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত পোস্টারগুলো অধিকাংশ সময়েই রাতের আধারে লাগানো হয়। যার কারনে সেগুলো আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। আমরা বিগত কয়েকদিন ধরে সরেজমিনে সেগুলো পরিদর্শন করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো আমরা অপসারণ করবো।