নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক হাতে পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পাঠ্যবই ছাপানো বিষয়ে এখনো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও চুক্তি করতে পারেনি। অথচ নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি আর মাত্র ৩ মাস। আর আগামী নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপা শুরু হলেও ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০-৩৫ শতাংশ বা ১০ কোটির বেশি বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া কাজ নেয়া বেশকিছু প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত বই সরবরাহ করতে পারবে কি না তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। আর কম দামে কাজ নেয়ায় সাদা কাগজের পরিবর্তে নিউজপ্রিন্টেও ছাপা হতে পারে বই। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে ১১টিরই নির্দিষ্ট মেশিন নেই। ফলে গত কয়েক বছরের মতোই শিক্ষার্থীরা এবারও ছোট ও ত্রুটিপূর্ণ বই পেতে পারে। এবার শিক্ষার্থীদের জন্য সোয়া ৩৩ কোটি পাঠ্যবই ছাপাতে হবে। অন্যান্য বছর এই সময়ে ৬ থেকে ৭ কোটি বই ছাপা শেষ হয়ে যায়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিনামূল্যের পাঠবই ছাপা নিয়ে এবার হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেরিতে শুরু করার কারণে এনসিটিবি এখন পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকসংক্রান্ত ৬টি দরপত্রের মধ্যে একটির প্রক্রিয়াও এখন পর্যন্ত শেষ করতে পারেনি। ফলে এখনো বই ছাপার জন্য কোনো চুক্তি হয়নি। আগামী বছর নতুন শিক্ষাক্রমে ৪টি শ্রেণিতে বই দেয়ার কথা থাকলেও বিলম্বের কারণে প্রাথমিকের পাইলটিং (পরীক্ষামূলক প্রয়োগ) করা যায়নি। তবে মাধ্যমিকে ষষ্ঠ শ্রেণির পাইলটিং কোনোমতে হলেও এখনো পর্যন্ত বই চূড়ান্ত হয়নি। তাছাড়া ডলার, জ¦ালানি তেল এবং কাগজসহ বই ছাপানোর অপরিহার্য উপাদানের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে বই ছাপা বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অথচ মুদ্রাকররা গড়ে প্রাক্কলিত দরের (যে দামে সরকার বই ছাপতে চায়) চেয়ে ২৫ শতাংশ কম টাকায় দরপত্র দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কাক্সিক্ষত মানের বই পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।-এফএনএস

সূত্র জানায়, এবার মোট ৩৩ কোটি ২৮ লাখ বই ছাপানোর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে এনসিটিবি। তার মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ব্রেইল বই এবং প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ও অনুশীলন গ্রন্থের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে দরদাতাদের কাছ থেকে সম্মতিপত্র (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) নেয়ার কাজ চলছে। চলতি সপ্তাহে প্রাথমিকের তৃতীয়-পঞ্চম শ্রেণির সম্মতিপত্র চাওয়া শুরু হয়েছে। ওই স্তরের প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির বইয়ের দরপত্র জাতীয় ক্রয় কমিটি ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মাধ্যমিকের অষ্টম-নবম শ্রেণির বইয়ের চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে ক্রয় কমিটি ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির দরপত্র অনুমোদন দিয়েছে। তার ফাইল এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে এনসিটিবিতে ফিরবে। তারপর দরদাতাদের কাছে সম্মতিপত্র চাওয়া হবে। নিয়ম অনুযায়ী সম্মতিপত্র চাওয়া হলে দরদাতারা অন্তত এক সপ্তাহ সময় পায়। তারপর চুক্তি করার জন্য দরদাতারা আরো ২৮ দিন সময় পায়। দরদাতারা পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) বা সিকিউরিটি মানি দিলেই এনসিটিবি সম্মত হয়। তারপর বই মুদ্রণের কার্যাদেশের পাশাপাশি পাণ্ডুলিপি দেয়া হয়। ওই পাণ্ডুলিপি যাচাই ও এনসিটিবির অনুমোদন নিয়ে বই মুদ্রণ শুরু করতে আরো ৩-৪ দিন সময় লেগে যায়।

সূত্র আরো জানায়, সম্মতিপত্র দেওয়ার পর থেকে বই ছাপা শুরু পর্যন্ত অন্তত দেড় মাস প্রয়োজন। ওই হিসাবে বেশি চাপাচাপি করা হলেও ১০ নভেম্বরের আগে কিছুতেই কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না। অথচ অন্যান্য বছর এই সময়ে প্রাথমিক স্তরেরই অনেক বই ছাপানো শেষে জেলা-উপজেলায় পৌঁছে যায়। ওই হিসাবে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি বই যাবে কিনা সন্দেহ আছে। সুতরাং বই নিয়ে বড় ধরনের সংকটই অপেক্ষা করছে। তবে এনসিটিবি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত যে সময়সূচি পাঠিয়েছে তাতে ২৩ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা আছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী কার্যাদেশ দেয়ার ৭০ দিনের মধ্যে অষ্টম-নবম আর ৬০ দিনের মধ্যে ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির বই সরবরাহ করতে হবে। আর ৫০ দিনের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির এবং ৭২ দিনের মধ্যে তৃতীয়-পঞ্চম শ্রেণির বই দরদাতাদের সরবরাহ করতে হবে। তাছাড়া দরপত্রে নির্ধারিত সময়ের পরও মুদ্রাকররা বই সরবরাহে ২৮ দিন সময় পায়। ওই সময়ের মধ্যে নামমাত্র জরিমানা দিয়ে বই সরবরাহের সুযোগ থাকে। ওই ২৮ দিনের সুযোগ নিয়ে চলতি বছর মার্চেও কেউ কেউ বই সরবরাহ করেছে। আর এমনটি ঘটলে আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে চলে যেতে পারে বই সরবরাহের কাজ। এমন অবস্থায় এনসিটিবিকে আংশিক বই সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে গত কয়েক বছর ধরেই প্রাক-প্রাথমিক স্তরে নিম্নমানের পাঠ্যবই দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া ডিজাইন অনুযায়ী বই ছাপানো হয় না। মুদ্রাকররা ত্রুটিপূর্ণ বা ডিজাইনবহির্ভূত বই সরবরাহ করছে। প্রথম-নবম শ্রেণির বই ছাপানোর জন্য দরপত্রে কোন সাইজের মেশিনে ছাপতে হবে তা উল্লেখ থাকে। ওসব বইয়ের আকার হলো পৌনে ১০ বাই সোয়া ৭ ইঞ্চি, যা ২০ বাই ৩০ ইঞ্চি মেশিনে ছাপা সম্ভব। আর প্রাক-প্রাথমিকের বইয়ের আকার হলো পৌনে ১১ বাই সোয়া ৮ ইঞ্চি। ওই বই ছাপতে পৌনে ২৩ বাই ৩৬ ইঞ্চি মেশিন দরকার। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রাক-প্রাথমিকের দরপত্রে মেশিনের সাইজ উল্লেখ করা হয় না। ওই সুযোগে যাদের ওই মানের মেশিন নেই তারাও কাজ পাচ্ছে। এবারও ওই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। যে ১২ প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে তাদের মাত্র একটির নির্ধারিত মেশিন আছে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম জানান, পাঠ্যবই নিয়ে এখন পর্যন্ত যে অবস্থা তৈরি হয়েছে তার দায় পুরোপুরি এনসিটিবির। কারণ যে দরে কাজ দেয়া হয়েছে তাতে অন্ত ৫০টি ফার্ম এবার বই-ই দিতে পারবে না। আবার অনেকের পক্ষে নিউজপ্রিন্টে বই সরবরাহ দূরের কথা, খালি কাগজ দিতে পারবে কিনা তাও সন্দেহ আছে। এমন অবস্থায় কারো কারোর বছরের শেষ সময় লক্ষ্য থাকে। কেননা বিতরণ সামনে রেখে তখন এনসিটিবি মানের বদলে কেবল বই চায়। ওই সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ নিউজপ্রিন্টে বই দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। ওই পরিস্থিতিতে হয়তো নির্ধারিত ১ জানুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বই যেতে পারে। তবে এনসিটিবি যদি দেরিতে প্রক্রিয়া শুরু না করতো এবং নিম্নদরের দরপত্র বাতিল করে ন্যায্যমূল্যে কাজ দিতো তাহলে হয়তো এমন অবস্থা তৈরি হতো না।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম জানান, এখন পর্যন্ত সবকিছু সময়সূচি অনুযায়ীই চলছে। কোনো বিলম্ব হয়নি। গত বছর মুদ্রণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি ২০ লাখ পর্যন্ত বই দেয়া হয়েছে। এবার ওই প্রতিষ্ঠানকে ২ কোটি বা তার কম বই দেয়া হয়েছে। এভাবে এবার অস্বাভাবিক হারে এমন কাউকেই কাজ দেয়া হয়নি। পাশাপাশি প্রাথমিকের মতো মাধ্যমিকেও এবার প্রাপ্য সময়ের অর্ধেকের মধ্যে ৫০ শতাংশ বই সরবরাহের বিধান করা হয়েছে। যেহেতু সক্ষমতা বিচার করে কাজ দেয়া হয়েছে এবং অর্ধেক বই পাওয়া যাবে। সঙ্কটের শঙ্কা নয় বরং যথাসময়েই বই শিশুরা পাবে। আর নিউজপ্রিন্টে বই সরবরাহ ঠেকাতে এবার দ্বৈত তদারকি সংস্থা নিয়োগ করা হয়েছে। কম দরে কাজ নেয়ার দায় মুদ্রাকরদের। কেউ নিম্নমানের বই দিয়ে পার পাবে না। ওই সুযোগও দেয়া হবে না।