চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি : হযরত শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) ছিলেন মধ্যযুগের একজন প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক। তিনি তৎকালীন গৌড় অঞ্চলে (বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মালদা নিয়ে গঠিত তৎকালীন বাংলার রাজধানী) ইসলাম প্রচার করেন। মোঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় ছেলে সুলতান শাহ সুজার রাজত্বকালে (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রিঃ) তিনি দিল্লী প্রদেশের করোনিয়ার নামক স্থান থেকে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে নানা স্থান ভ্রমণ করে বাংলার রাজধানী গৌড় অঞ্চলে আসেন। তার আগমনবার্তা জানতে পেরে সুলতান শাহ সুজা তাকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানান এবং তার নিকট বায়াত গ্রহণ করেন।

পরে শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) গৌড়ের যা বর্তমান বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুরে স্থায়ীভাবে ইসলাম প্রচারকেন্দ্র স্থাপণ করেন। শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) এর অনুসারীদের মতে, ভাদ্র মাসের শেষ শুক্রবারে গৌড় অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে আসেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রত্যেক বছরের ভাদ্র মাসের শেষ শুক্রবার সোনামসজিদ ও তোহাখানায় শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) এর ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়।

প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ঐতিহাসিক সোনামসজিদ ও তোহখানায় শাহ্ নেয়ামতুল্লাহ (রহঃ) এর ঔরশ শরীফ পালিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (০৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলল্লিরা তোহখানায় এসে জমায়েত হয়। সারারাত ধরে কোরআনখানী জিকির আজকারে করেন মুসল্লীরা। শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হয় মুসলল্লিদের মাজার জিয়ারত ও দোয়া মাহফিল।

জুম্মার নামাজে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় বিশেষ মোনাজাত হয়। বাদ জুম্মা হযরত শাহ্ নেয়ামতুল্লাহ (রহঃ) এর ব্যবহারিত কাপড় চোপড় দেখানো হয় মুসল্লিদের। ওরশে আসা মুসলল্লিদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেন ওরশ ব্যবস্থাপনা কমিটি। এদিকে, ঔরশকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছর থেকে রাজশাহী-সোনামসজিদ স্থলবন্দর মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যের প্রায় ৫ শতাধিক দোকানপাট বসে।

ষাটোর্ধ অবসরপ্রাপ্ত বিচারক তরিকুল ইসলাম পরিবার নিয়ে এসেছেন তোহাখানায়। তিনি বলেন, গত ৫০ বছর ধরে প্রত্যেক বছরের এই দিনে তোহাখানায় জুম্মার নামাজ আদায় করি। হযরত শাহ্ নেয়ামতুল্লাহ (রহঃ) এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাকে দাওয়াতে সায় দিয়ে অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি এই অঞ্চলের ইসলাম ধর্মের মানুষদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।

ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি মোঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় ছেলে সুলতান শাহ সুজার ব্যাপক সহায়তা পেয়েছিলেন। সেই সুবাদে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ আশেপাশের জেলাগুলোতে বিভিন্ন মসজিদ-মাদরাসা স্থাপণ করেন। নাটোর থেকে এসেছিলেন আলহাজ্ব রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, পরিবার নিয়ে প্রত্যেক বছর আসি। একটি পবিত্র দিনে এই জায়গায় নামাজ পড়ে আত্মতুষ্টি পায়। মাঝেমধ্যে আগেরদিন রাতেও এখানে আসি। এখানে রান্না করে দুপুরের খাবার খেয়ে মাজার জিয়ারত করে বাসায় ফিরে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাকিম বলেন, আমরা ছোট থেকেই দেখি এখানে ভাদ্র মাসের শেষ শুক্রবার ওরশ হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসে। একদিনের জন্য ব্যাপক সংখ্যক মুসল্লীর উপস্থিতি ও দোকানপাট বসে একদিনের মেলায় পরিণত হয় সোনামসজিদ ও তোহাখানা। এখানে পার্শ্ববর্তী পশ্চিমাঞ্চলের মালদা জেলা থেকেও অনেক মুসল্লীরা আসেন। তবে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট বন্ধ থাকায় এবছর ভারতের মুসল্লীরা আসতে পারেননি। শুক্রবার (০৯ সেপ্টেম্বর) তোহাখানায় জুম্মার নামাজ আদায় করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ডা. শামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল, শিবগঞ্জ থানার অফিসার-ইন-চার্জ ফরিদ উদ্দিনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা।

উল্লেখ্য, শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছর এই অঞ্চলে সুনামের সাথে ইসলাম প্রচার করেন। পরে তিনি পিরোজপুরেই ১০৭৫ হিজরী (১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) মতান্তরে ১০৮০ হিজরীতে (১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) পরলোকগমন করেন। তাকে তোহাখানায় সমাহিত করা হন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে সীমান্তঘেঁষা শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নে তোহাখানার ভেতরে শাহ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) এর তিন গম্বুজ মসজিদের উত্তরে শাহ নেয়ামতউল্লাহের মাজার অবস্থিত।