এফএনএস : জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩ টার দিকে জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ৫১তম বাজেট। বর্তমান সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের চতুর্থ বাজেট। এটি আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৪তম বাজেট। এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের চতুর্থ বাজেট। বাজেটটি প্রস্তুত হয়েছে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামে। প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাধিকার পাবে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এবারের বাজেটে সঙ্গত কারণেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি খাত, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা খাতসহ বেশ কিছু খাতকে।

বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে যা ছিল ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে নতুন বাজেটের আকার বাড়ছে ৭৪ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয়ের বিপরীতে অর্থের সংস্থান কম। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরে ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। বাজেটের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ০৬৪ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছর ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। যা গত অর্থবছর ছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে চায় সরকার। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার কারণে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৯টি পণ্যের (জ¦ালানি তেল, এলএনজি, গম, রাসায়নিক সার, পাম অয়েল, সয়াবিন তেল, কয়লা, ভুট্টা ও চাল) একই পরিমাণ আমদানি করতে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। এসব পণ্যের বাইরেও আন্তর্জাতিক বাজারে শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ বেড়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ অনুভূত হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকার দেশে বর্তমানে বিরাজমান চাহিদার প্রবৃদ্ধি কমিয়ে সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চায়। কোভিড-১৯ অতিমারিজনিত অর্থনৈতিক শ্লথগতি থেকে উত্তরণের উদ্দেশ্যে শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি খাতের পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার যে কাউন্টার সাইক্লিক্যাল ব্যবস্থা নিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল, ক্ষতিগ্রস্ত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের উদ্যোগের জন্য ৭৩ হাজার কোটি টাকা এবং সিএমএসএমই খাতের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণের তহবিল, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইএফডি) ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে বৃদ্ধি এবং ২ শতাংশের বেশি সুদের হারে ভর্তুকি দেওয়া এবং ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প। তিনি বলেন, সরকার রপ্তানিমুখী শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, রপ্তানি পণ্যের জন্য নতুন বাজার অনুসন্ধান, পরিবহন ও ইউটিলিটি সুবিধার উন্নয়ন এবং দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক অগ্রাধিকার এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ অ্যান্ড এফটিএ) ইত্যাদি স্বাক্ষরের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। উপরন্তু সরকার রপ্তানি বাড়াতে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করছে। পাশাপাশি সরকার রপ্তানি বাড়াতে রপ্তানি ভর্তুকি/প্রণোদনা অব্যাহত রেখেছে।

মুস্তফা কামাল বলেন, দেশের স্বল্প-আয়ের জনগোষ্ঠী যাতে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারে সে জন্য সরকার ন্যায্যমূল্যে খোলাবাজারে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করছে। শহর অঞ্চলে ওএমএস-এর আওতায় চাল ও গম বিক্রয় অব্যাহত রয়েছে। রমজানে ১ কোটি পরিবারকে কার্ডের মাধ্যমে ৬টি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হয়েছে যাদের কাছে ডিজিটাল ব্যবস্থায় নগদ অর্থ দেওয়ার সক্ষমতা সরকারের রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মজুতকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে আগামী অর্থবছরে জ¦ালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার ও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের যে ঘাটতি হবে তা আমরা মূল্য বাড়িয়ে ভোক্তা পর্যায়ে শতভাগ চাপিয়ে দেবো না। অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছরের ন্যায় চলতি অর্থবছরেও বাজেট প্রণয়নের অংশ হিসেবে আমি দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো, স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আগামী ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সংলাপ করেছি। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়/বিভাগ এবং বিভিন্ন সংগঠন থেকে বাজেটের ওপর প্রস্তাবনা পেয়েছি। এজন্য আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ অভাবনীয় স্বর্ণালী এক অধ্যায় পার করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে শান্তি, প্রগতি আর সম্প্রীতির এক মিলনমেলায়। একের পর এক রচিত হচ্ছে উন্নয়নের সাফল্যগাথা। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য অনুকরণীয় উন্নয়ন স্বপ্নদ্রষ্টা। তার নেতৃত্বে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীর তুলে ধরা গেলো ১৩ বছরের হাজারো অর্জনের উল্লেখযোগ্যগুলো হলো- জাতীয় সংসদ পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় সব কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে। গত ১৩ বছরে জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০১৬-২০১৭, ২০১৭-২০১৮ ও ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল এবং ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৮ শতাংশ অতিক্রম করে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতেও ২০২০-২০২১ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ ছিল। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে অর্জিত গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫), প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১) এবং বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রণয়নকরত বাস্তবায়ন কার্যক্রম গ্রহণ।

অর্থমন্ত্রী বলেন, জিডিপির আকার ৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা থেকে ৩৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মাথাপিছু আয় ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে ৫৪৩ মার্কিন ডলার হতে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার। মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত আছে। দরিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ হতে কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অতি দরিদ্রের হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছুঁয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০২১ সালের ২৩ আগস্ট)। বাজেটের আকার ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরের তুলনায় ১১ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ দুই হাজার ৫০৫ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৪,৯০০ মেগাওয়াট থেকে ২৫,৫৬৬ মেগাওয়াটে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচির আওতায় আজ বাংলাদেশের শতভাগ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার ও ভারতের সমুদ্রসীমা নিয়ে আইনি বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের এলাকাভুক্ত সমুদ্রের অংশ, এক্সক্লুসিভ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মহীসোপানসহ মোট এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার ওপর স্বত্ত্বাধিকার লাভ করে।

সমুদ্রের নীল জলরাশি ও তার সম্পদ আহরণে এ উন্মুক্ত অধিকারের সুযোগ কাজে লাগাতে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এ সুনীল অর্থনীতির কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। নিম্নআয়ের দেশ থেকে গ্রাজুয়েশন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত ধাপ অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের (সিইবিআর) উদ্ধৃতি দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক বিকাশ অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে আজ বিশ্বের বিস্ময় বাংলাদেশ। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মুখে আজ বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা। সম্ভাবনার এ স্বর্ণদুয়ার উন্মোচনে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন অতীতের ঐতিহ্য সুরক্ষা, বর্তমানের সফল পথচলা এবং ভবিষ্যতে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অকুতোভয় ও বিশ্বস্ত কাণ্ডারি। আমরা দেশবাসী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিনম্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

প্রস্তাবিত বাজেট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন: এর আগে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বেলা ১২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের পশ্চিম ব্লকের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত মন্ত্রিসভা কক্ষে এ বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এতে অংশ নেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার দিন মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক বসে, এতে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।