এফএনএস : ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদেশিক মুদ্রা সুরক্ষায় বিলাসবহুল পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে কিছু পণ্যের ওপর যোগ হয়েছে শুল্ক ও কর। ফলে সেসব পণ্যের দাম বাড়ছে। আবার প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু পণ্যের ওপর শুল্ককর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে দেশের বাজারে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনায় এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে

আমদানিকরা বিলাসী পণ্য যেমন-বডি স্প্রে, প্রসাধনী পণ্য, জুস, প্যাকেটজাত খাদ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমদানিতে নতুন করে শুল্ক আরোপ হতে পারে। যদিও ইতোমধ্যে গত ২৩ মে এক প্রজ্ঞাপনে বিদেশি ফল, বিদেশি ফুল, ফার্নিচার ও কসমেটিকসজাতীয় প্রায় ১৩৫টি এইচএস কোডভুক্ত পণ্যের ওপর আমদানি পর্যায়ে বিদ্যমান ৩ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে ওই তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

তামাকজাত পণ্য : অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণে এবার বৃদ্ধি পাচ্ছে তামাকজাত পণ্যের মূল্য। স্ল্যাব অনুসারে শুল্ক আরোপ হয়েছে।

স্মার্টফোন : দেশীয় পণ্য সুরক্ষায় শুল্ক আরোপে আমদানি করা স্মার্ট মোবাইল ফোনের দাম আরেক দফায় বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে সুবিধা পাবে দেশীয় কোম্পানিগুলো।

রেলের টিকিট : শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত/তাপানুকুল সার্ভিসের পাশাপাশি প্রথম শ্রেণির রেলওয়ে সেবার ওপর ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাব করায় রেল ভ্রমণে লাগবে বাড়তি খরচ। তবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উড়োজাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে আগাম কর অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সোলার প্যানেল : বর্তমানে সোলার প্যানেল আমদানিতে শূন্য শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য রয়েছে। দেশীয় সোলার সেক্টরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি করা সোলার প্যানেলের ওপর বিদ্যমান আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিদেশি কফি : বাড়ছে বিদেশ থেকে আমদানি করা কফির দামও।

বিলাসবহুল গাড়ি : মূল্যবৃদ্ধি তালিকায় যুক্ত হচ্ছে বিলাসবহুল গাড়ি। ৪০০০ সিসির ওপর বিলাসবহুল রিকন্ডিশন গাড়িতে সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও আগাম কর এবং ভ্যাট মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৮০০ শতাংশে করহার প্রস্তাব করা হয়েছে।

রেফ্রিজারেটর : রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজার উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে অব্যাহতি প্রত্যাহার করে ভ্যাটের হার ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এতে ফ্রিজের দাম বাড়তে পারে। অবশ্য ফ্রিজ তৈরির উপকরণ ও যন্ত্রাংশ আমদানি এবং স্থানীয় ক্রয়ের ক্ষেত্রে কর ছাড় সুবিধা রয়েছে। তা ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

বাটার ও চিজ : বাটার ও চিজ বা পনির পণ্য দুটি সমজাতীয় উল্লেখ করে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাটার আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বিদ্যমান থাকলেও চিজ আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক আরোপিত নেই। তাই বাটারের মতো চিজ আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মুঠোফোনের বিদেশি চার্জার: দেশে উৎপাদিত মুঠোফোন উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আরও বিকশিত করার লক্ষ্যে বিদেশি চার্জারের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।

গ্যাস লাইটার: বর্তমানে দেশে গ্যাস লাইটার বা দেশলাই উৎপাদিত হচ্ছে। তাই দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য পণ্যটি আমদানির ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই বিবেচনায় লাইটারের যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ওয়াটার পিউরিফায়ার: বাসাবাড়িতে পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য ব্যবহৃত ওয়াটার পিউরিফায়ারের আমদানি শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।

ক্যাশ রেজিস্ট্রার: ব্যবসার ক্যাশ রেজিস্ট্রার আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ। অপরদিকে টিকিট ক্যালকুলেটিং যন্ত্রের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ। মেশিন দুটি প্রায় একই ধরনের হওয়ায় শুল্কহার সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। তাই ক্যাশ রেজিস্ট্রারের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

বিদেশি পাখি: বর্তমানে দেশে বিলাসবহুল পাখি আমদানি হচ্ছে। ওই পণ্যের ওপর ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য রয়েছে। পাখিগুলো বিলাসবহুল বিধায় আলোচ্য ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

দাম কমছে যেসব পণ্যের

দেশে উৎপাদিত প্রযুক্তিপণ্য: দেশে উৎপাদিত আইটিপণ্যে বর্তমানে শুল্ক দিতে হয় ৫ শতাংশ। তবে স্থানীয় শিল্পের বিকাশে এবার এ শিল্পখাতে আরও শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে দেশে উৎপাদিত ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, প্রিন্টারসহ সব ধরনের আইটিপণ্যের দাম কমতে পারে। তবে আমদানি করা ল্যাপটপ, কম্পিউটারসহ আইটিপণ্যের আরও বাড়বে।

কৃষি যন্ত্রপাতি-সরঞ্জাম: কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে দেশীয়ভাবে বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ফলে দেশে কৃষি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের উৎপাদনে শুল্ককর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। এতে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের দাম কমতে পারে।

স্বর্ণালঙ্কার: জুয়েলারি শিল্পের প্রসারে স্বর্ণ আমদানিতে অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দেশের বাজারে স্বর্ণালঙ্কারের দাম আগের তুলনায় কমতে পারে।

হুইল চেয়ার: প্রস্তাবিত বাজেটে বিশেষায়িত হুইল চেয়ারের আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক বিলোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ হুইল চেয়ার আমদানিতে কোনো শুল্ক থাকবে না। ফলে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের ব্যবহৃত বিশেষায়িত হুইল চেয়ারের দাম কমবে।

মুড়ি ও চিনি: প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসায়ীপর্যায়ে মুড়ি ও চিনির ওপর ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে বাজারে এ দুটি পণ্যের দাম কমতে পারে।

কাজু ও পেস্তাবাদাম: বিদেশ থেকে আমদানি করা কাজু ও পেস্তাবাদামের ওপর শুল্ককর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। ফলে দেশের বাজারে আমদানি করা কাজুবাদাম ও পেস্তাবাদাম দাম কমতে পারে।

দেশে উৎপাদিত মোবাইল: স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের শুল্ক ও ভ্যাট সুবিধা ভোগ করে আসছে। যেখানে আমদানি করা হ্যান্ডসেটের ওপর ৫৮ শতাংশ শুল্ককর প্রযোজ্য। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও অ্যাসেম্বলড (সংযোজিত) হ্যান্ডসেটের জন্য কর দিতে হয় যথাক্রমে ১৩ ও ১৮ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে এ সুবিধা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। ফলে আমদানি কর মোবাইলের তুলনায় তুলনামূলক কম দামে ফিচার ফোন (বাটন মোবাইল) মিলতে পারে।

ব্রেইল মুদ্রণ ও কানে শোনার যন্ত্র: বাজেটে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পড়ার উপকরণ ব্রেইল মুদ্রণের ওপর ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। অন্যদিকে শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের জন্য কানে শোনার যন্ত্র ও এ যন্ত্রে ব্যবহৃত ব্যাটারি আমদানিতে শুল্ককর ২৫ শতাংশ কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে ব্রেইল মুদ্রণ ও কানে কম শোনার যন্ত্রের দাম কমতে পারে।

মেডিটেশনপণ্য: প্রস্তাবিত বাজেটে মেডিটেশন সেবার ওপর বিদ্যমান কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এ সম্পর্কিত সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম কমবে।

দেশে তৈরি গাড়ি: ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা পাচ্ছে দেশীয় গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। মোটরগাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি ৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে দেশে তৈরি গাড়ি তুলনামূলক কম দামে মিলবে।

আয়রন শিট স্টিলজাতপণ্য: প্রস্তাবিত বাজেটে গ্যালভানাইজড আয়রন ও স্টিলজাতপণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত এইচ আর কয়েল এবং জিঙ্কজাতীয় কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে করহার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে স্টিলজাত সব ধরনের পণ্যের দাম কমবে।

স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের ব্যয় কমবে: প্রস্তাবিত বাজেটে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের ব্যয় সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে টার্নওভার কর শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশের পরিবর্তে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের দেওয়া আইটি সেবায় ব্যয় কমবে।

পলিথিন-প্লাস্টিক ব্যাগ: সব ধরনের পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যাগ (ওভেন প্লাস্টিক ব্যাগসহ) এবং মোড়কীকরণ পণ্যের ওপর কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে দেশের বাজারে এসব পণ্যের দাম কমবে।

পানির ফিল্টার: প্রস্তাবিত বাজেটে পানির ফিল্টারের ওপর শুল্ককর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে পানির ফিল্টারের দাম কমতে পারে। এ ছাড়া বিমানের জন্য ব্যবহৃত টায়ারের দামও কমবে।