এফএনএস : সরকারি গুদামে মজুদ করা লাখ লাখ টন বোরো চাল মানহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন মজুদ রাখার কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কারণ বর্তমানে দেশের গুদামগুলো বেশ পুরনো হয়ে পড়েছে। আর ওসব গুদামে পোকামাকড়ের উপদ্রবও বেশি। পুরনো ওসব খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিবেশের অভাব রয়েছে। আবার বোরো চালের সংরক্ষণ সক্ষমতাও বেশ কম। ফলে দ্রুত বিতরণ করতে না পারলে মজুদ করা বিপুল পরিমাণ বোরো চাল দ্রুত মানহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য অধিদপ্তর জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের দ্রুত চাল ছাড় করার বিষয়ে চিঠি দিয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত বছর বোরো মৌসুমে খাদ্য অধিদপ্তর ১৪ লাখ টনের কিছু কম উৎপাদিত চাল সংগ্রহ করেছিল। তার মধ্যে এখনো ৮ লাখ টনের কাছাকাছি বোরো চাল মজুদ অবস্থাতেই রয়েছে। এমন অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ওসব চাল মানহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে খাদ্য অধিদপ্তর। সেজন্য গত বছর সংগৃহীত বোরো চাল দ্রুত ছাড়করণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে সারা দেশে চলতি বছরের বোরো মৌসুমের আবাদ কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।

তবে খাদ্য অধিদপ্তরের গত বছর সংগৃহীত বোরো চালের মজুদ এখনো অর্ধেকও ফুরায়নি। বোরো মৌসুমের চাল দীর্ঘদিন সংগ্রহে রাখা যায় না। গত বোরো মৌসুমে চাল সংগৃহীত হয়েছিল প্রায় ১৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৫২ টন। তার মধ্যে মিলারদের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল ১১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬৩ টন। এখনো সারা দেশের এলএসডি ও সিএসডিগুলোয় গত বছর সংগ্রহ করা ৭ লাখ ৭০ হাজার ৮৬৯ টন বোরো চাল মজুদ রয়েছে। তার মধ্যে সেদ্ধ চাল ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭১ টন ও আতপ চাল ১২ হাজার ২৯৮ টন। রাজশাহীতে বোরো চালের সবচেয়ে বেশি মজুদ রয়েছে। সেখানে মজুদ চালের পরিমাণ ১ লাখ ৮৮ হাজার ১৫৩ টন। তারপর সবচেয়ে বেশি রংপুর বিভাগে মজুদ রয়েছে।

ওই বিভাগের গুদামগুলোয় এখনো ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬৭ টন বোরো চালের মজুদ রয়েছে। খুলনা বিভাগে মজুুদ রয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৬ টন। তাছাড়া ঢাকা বিভাগে ৮৭ হাজার ৩৩১ টন, ময়মনসিংহে ৭৭ হাজার ৩৯৬ টন, চট্টগ্রামে ৮৬ হাজার ৩৬২ টন, সিলেটে ২ হাজার ৭৪৯ টন এবং বরিশালে ২০ হাজার ৯৪৫ টন বোরো চালের মজুদ রয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বেশি। এমন ধরনের আবহাওয়া কীটপতঙ্গ জন্মানোর জন্য আদর্শ। পাশাপাশি দেশের গুদামের মানও খুব বেশি ভালো না। ফলে আবহাওয়ার কারণে মজুদকৃত চালে দ্রুত পোকার আক্রমণ হয়। আবার দেশের খাদ্য মজুদ ব্যবস্থাপনাও খুব বেশি উন্নত নয়। ফলে ৪-৬ মাসের বেশি মজুদ রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি চালের সংগ্রহের সময়ও চালের মান যাচাই-বাছাই করে নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু সংগ্রহের সময়ে বিভিন্ন চাপে মানহীন চাল নেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে মুজদ করা ওই চাল বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না।

পাশাপাশি দেশে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক ব্যবস্থারও ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিদ্যমান পুরনো খাদ্যগুদামে কীটের আক্রমণের শঙ্কা রয়েছে। সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে গুদামজাত খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে এখন খাদ্যশস্য মজুদের জন্য সনাতনী পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়েছে। সেজন্য আধুনিক সাইলো তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওসব সাইলোয় খাদ্যশস্য মজুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ থাকে। আবার কীটপতঙ্গ প্রতিরোধে স্থাপনা নির্মাণকালে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

তাছাড়া বাতাসের আর্দ্রতা ও উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত কারিগরি সক্ষমতার ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম জানান, প্রথাগত গুদাম ও চাল সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে চালের মান ধরে রাখাটা একটু কঠিন। তবে আধুনিক মানের গুদাম তৈরি করার চেষ্টা চলছে। বেশকিছু আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির গুদাম নির্মাণাধীন রয়েছে। আবার আমন মৌসুমের জন্য চাল সংগ্রহ করতে হবে। সেজন্য গত বছরের বোরো মৌসুমের সংগৃহীত চাল দ্রুত খালি করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে বোরোর মজুদ খালি হলেও আমন মৌসুমের চাল দিয়ে সেটি দ্রুতই পূরণ করা সম্ভব হবে। ফলে মোট মজুদে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।