এফএনএস : বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তির উন্নয়নে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের প্রথম পরিকল্পনা গৃহীত হয় ১৯৬১ সালে। সে থেকে এই প্রকল্প স্থাপনের সম্ভ্যাবতা যাচাইয়ের পর ১৯৬৩ সালে পাবনার রূপপুরকে প্রকল্পের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকার পারমাণবিক শক্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করে, এবং জুন ২৪, ২০০৭ সালে সরকার দেশে বিদ্যুত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার সাথে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের আলোচনা শুরু করে এবং একই বছরের ১৩ই ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বা MOU (Memorendum of Understanding) স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, এবং চীনের সাথে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা শীর্ষক একটি সহযোগিতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুত জ¦ালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড স্থানীয় পর্যায়ে যুক্ত আছে।

ফেব্রুয়ারি ২, ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আণবিক শক্তি করপোরেশনের (রসাটম) সাথে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় পাবনা জেলার রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া ২০০০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে দুটি পারমাণবিক চুল্লী স্থাপন করবে এবং আগামী পাঁচ বছর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সীমা নির্ধারিত হয়েছে। ২০২১ সালের শুরুতে আনুমানিক দুই বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিতব্য এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি উৎপাদনের জন্য চালু হবে বলে জানিয়েছিলেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কমিশনের মহাপরিচালক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কিরিয়েঙ্কো।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে রাশিয়ার সমর্থন এবং সহযোগিতা চেয়েছেন। গত সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে তার সঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে শেখ হাসিনা এই সমর্থন-সহযোগিতা চান। পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম বৈঠক সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে চাই এবং এ ব্যাপারে রাশিয়ার অব্যাহত সহযোগিতার প্রয়োজন।’ বাংলাদেশ পাবনার রূপপুরে রাশিয়ার কারিগরি এবং আর্থিক সহযোগিতায় প্রথম বারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটম এই সহযোগিতা দিয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী রোসাটম’র মহাপরিচালককে স্থানীয় জনগণকে প্রশিক্ষণ দেয়ার আহ্বান জানান, যাতে তারা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (আরএনপিপি) চালাতে পারে।

আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, বাংলাদেশ এবং রাশিয়ার পারস্পরিক সহযোগিতা পারমাণবিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে এবং ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তিধর দেশে পরিণত হবে। তিনি বলেন, আরএনপিপি পরিচালনার জন্য তারা বাংলাদেশিদের প্রশিক্ষণ দিবেন এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তিনি স্থানীয় কর্মীদের প্রশংসা করে বলেন, ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান এবং অন্যান্য জনবলসহ ২০ হাজারের ও বেশি মানুষ আরএনপিপিতে কাজ করে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। তিনি বলেন, অনেক বাংলাদেশি কোম্পানিও সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করছে।

রোসাটম’র মহাপরিচালক আরএনপিপি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু কমিশনের সহযোগিতার প্রশংসা করে বলেছেন, কিন্তু ‘বাস্তবায়নের সময় সমন্বয় করা যেতে পারে।’ নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, আরএনপিপি’র নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিবেন এবং তারা প্লান্টের কাছাকাছি এলাকায় সামাজিক উন্নয়নেও কাজ করছেন। এদিকে রোববার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লির উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পরমাণু যুগে প্রবেশ করে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। এই পরমাণু শক্তি ব্যবহার হবে শান্তির জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য। পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। সেই বিদুৎ যাবে গ্রামের মানুষের কাছে। আর তাতে তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হবে। বেলা সাড়ে ১১টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমরা এখন পরমাণু শক্তির একটা অংশ। সে হিসেবে আমি বলব সেখানে একটা স্থান আমরা করে নিতে পারলাম এবং সেটা শান্তির জন্য। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পরমাণু শক্তি আমরা শান্তির জন্য ব্যবহার করছি। এ সময় আর যেন কোনো শকুনের থাবা না পড়ে বাংলাদেশের ওপর এবং বাংলাদেশের এই উন্নতি এবং অগ্রগতি যেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যায়, সেজন্যও সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

বিএনপি বিদ্যুৎ খাতকে ধ্বংস করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতার মসনদে বসে একের পর এক দুর্নীতির ফন্দি করতে থাকে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাত ছিল অন্যতম। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করলেও বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে ৩ হাজার মেগাওয়াটে নামিয়ে আনে। যেটি বিদ্যুৎ খাতের জন্য অশনি সংকেত ছিল। তিনি বলেন, এক ফোঁটা বিদ্যুৎও তারা বাড়ায়নি। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। তাই দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি দুর্নীতিতে বিশ্বাসী আর আমরা উন্নয়নে বিশ্বাসী। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ তার বড় প্রমাণ। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করছি। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন জাতির পিতা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করে সেই স্বপ্ন মুছে দিতে চেয়েছিল একটি গোষ্ঠী। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তারা ভেবেছিল তাকে হত্যা করলেই সফল হতে পারবে। তাদের সেই বিশ্বাসঘাতকতা বাঙালি ভুলে যায়নি।

দেশে এখন বিদ্যুৎ সংকট নেই দাবি করে তিনি বলেন, দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে। গ্রামগঞ্জের বাড়িতে বাড়িতে এখন বিদ্যুৎ। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে গ্রামগঞ্জ অর্থনৈতিকভাবে আরো সমৃদ্ধ হবে। এ লক্ষ্যে দক্ষিণাঞ্চলে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আর কোনো শকুনের থাবা পড়তে দেওয়া হবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎকে দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি আখ্যায়িত করে বলেন, সরকার দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলেই আরেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করবে। আমার ইচ্ছে পদ্মার ওপারেই অর্থাৎ দক্ষিণাঞ্চলে করার। আমরা জায়গা খুঁজছি এবং আশা করি, এ ব্যাপারে খুব একটা অসুবিধা হবে না। এখানে যদি আরেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট আমরা করতে পারি তাহলে বিদ্যুতের জন্য আমাদের আর অসুবিধা হবে না।

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, বাংলাদেশের জন্য আজকে এটা সত্যিই খুব গুরুত্বপূর্ণ দিবস। আজকের দিনটি শুধু বাংলাদেশ নয়, আমার ব্যক্তিগত জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনটি সত্যিই আমাদের জন্য খুবই একটা আনন্দের দিন। করোনার কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারায় নিজের মনোবেদনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে সশরীরে দেখতে যাব।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা প্রায় তিন থেকে চার স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। অর্থাৎ রি-অ্যাক্টরের কাছে বা একেবারে ভেতরে যারা কাজ করবে তাদেরও অভিজ্ঞতা দরকার, প্রশিক্ষণ দরকার, তার বাইরে আরেক স্তরে যারা আছে তাদের দরকার। তার পাশাপাশি পুরো এলাকার নিরাপত্তার ব্যবস্থাটাও আমরা নিয়ে নিয়েছি।

পরিবেশ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, অ্যাটমিক নিউক্লিয়ার পাওয়ারে কখনো পরিবেশদূষণ হয় না, এখন সবখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। কাজেই সেখানে কোনোরকম দুর্ঘটনা ঘটার খুব একটা সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশে অনেকে না জেনে সমালোচনা করেন। আমাদের বাংলাদেশে একটা কিছু করতে গেলে এত সমালোচনা, নানাভাবে নানাজনে, কেউ বুঝে না বুঝে অনেক কথা বলে ফেলেন, অনেক কথা লিখে ফেলেন। টকশোতে অনেকে টক, ঝাল, মিষ্টি কত কথা বলেন, এটা হচ্ছে বাংলাদেশের নিয়ম।
পরমাণুকেন্দ্র স্থাপনের ফলে এ বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে আমাদের দেশে যারা বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী বা যারা নিউক্লিয়ার বিষয়ে কাজ করেন সবারই কিন্তু একটা অভিজ্ঞতা হলো। কারণ তাদের ট্রেনিং করাতে হচ্ছে। তাদের রাশিয়া-ইন্ডিয়াতে ট্রেনিং করাচ্ছি।

পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুফলের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমি মনে করি যে, এই বিদ্যুৎটা যখন ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে, ইতোমধ্যে আমরা কিন্তু সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজও শুরু করে দিয়েছি। কাজেই আমরা ২০২৩ সালের মধ্যে আশা করি এই বিদ্যুৎ পাব। ২০২৪ সালে আমাদের দ্বিতীয় ইউনিট শুরু হয়ে যাবে। কাজেই এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি হবে, সেটাই আমরা বিশ্বাস করি।

উল্লেখ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব জিয়াউল হাসান স্বাগত বক্তৃতা করেন। প্রকল্প পরিচালক ও পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মো. শওকত আকবর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল যন্ত্র রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের সময় আরএনপিপি থেকে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত হন। অনুষ্ঠানে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়। পারমাণবিক প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা-ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক অ্যানার্জি অ্যাসোসিয়েশন (আইএইএ)-র গাইড লাইন অনুযায়ী এবং সংস্থাটির কড়া নজরদারির মধ্য দিয়েই রূপপুর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প (আরএনপিপি) বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।