শাহানুর রহমান রানা : এক সহকর্মীর সাথে পেশাগত কাজে যাচ্ছিলাম লক্ষিপুর। বর্ণালীস্থ সোনামণি নিবাসের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ফিডারে দুধ পানরত এক শিশুকে। শিশুটি ছিল এক পুরুষের কোলে। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন দু’জন মহিলা। তারা তিনজন মিলে কি যেনো নিয়ে আলাপচারিতায় ছিলেন ব্যস্ত। তাদের মুভমেন্ট আর কথাবার্তা বলার ধরণ দেখে মনে সন্দেহ জাগে। সহকর্মীর চোখেও বিষয়টি ধরা পড়ে। তৎক্ষণাত কাল বিলম্ব না করে বাইক থামিয়ে আবার পিছনে ফিরে এলাম। কথা হলো উপস্থিত সবার সাথেই। বিস্তারিত আলাপচারিতায় অবশেষে জানা গেল চৌদ্দ-পনের মাসের কোলের শিশুটির কাহিনী। শুনে পেশাদারিত্বের কারণে অনেক কষ্টে আটকে রাখলাম চোখের পানি। শুনলাম মা-হীন (থেকেও নেই) শিশুটির বর্তমান আর অতীত বিষয়ের ঘটনাবলী।

তানোর থেকে বাবাটি এসেছেন বিভাগীয় শহর রাজশাহীর কোন একটি এতিম খানায় মা হারা শিশু বাচ্চাটিকে দিয়ে দিতে। কিন্তু একাধিক স্থানে চেষ্টা করেও সেই সমস্যার কোন কুল-কিনারা পেলেন না বাবা আবুল হোসেন। শিশুটির জন্ম ২০২০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। নব্বই উর্দ্ধ দাদি ভালবেসে তার নাম রেখেছিলেন ইসরাফিল। নগরীর বর্ণালীস্থ সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন সোনামণি নিবাসের উচ্চমান সহকারী শরিফুল জানান, কোন শিশু বাচ্চার বাবা জীবিত থাকলে সেই বাচ্চাকে নেবার কোন এখতিয়ার তাদের নেই। একই অবস্থা শিশু পল্লীর বলেও তিনি জানান। যার কারণে বাবা আবুল হোসেন মা হারা শিশুটিকে সেখানে দিতে পারেন নি।

বাবা আবুল হোসেনের সাথে বিস্তারিত আলোচনায় জানা গেছে, শিশু বাচ্চাটির মা তানোর দেবিপুর এলাকার জহুরাকে তিনি বিয়ে করেন প্রায় দশ বছর পূর্বে। সংসার জীবনের প্রথম দিকে জন্ম নেয় একটি মেয়ে। প্রথম মেয়ে সন্তান আখি (৮) এখন পড়েন তানোরের একটি মাদ্রাসায়। প্রতিমাসে আখির পেছনে বাবার খরচ প্রায় দুই হাজার টাকার মতো বলে জানান তিনি। আবুল হোসেন একসময় রাজশাহীতে ইজিবাইক চালাতেন। দ্বিতীয় সন্তান ইসরাফিল জন্মের পরে তিনি রাজশাহী থেকে চলে জান নিজের এলাকায়। আবুল হোসেন শুনেছেন, তার স্ত্রী জহুরা রাজশাহী নগরীর ডিঙ্গাডোবা এলাকার একটি ছেলের সাথে প্রেমে আবদ্ধ হয়ে প্রেমিকের সাথেই থাকেন। একদিকে, বড় মেয়ের খরচ, অন্যদিকে, নব্বই উর্দ্ধ বয়সের মা। শিশু বাচ্চাটিকে দেখভালের জন্য বাড়ীতে কেউ না থাকায় তিনি অবশেষে বাচ্চাটিকে কোন এতিমখানা কিংবা সরকারি কোন সংস্থায় দিয়ে দিতে চাইছিলেন।

কিন্তু সে পথও বন্ধ সরকারি নিয়মনীতি আর আইন কানুনের বেড়াজালে। উল্লেখ্য যে, আবুল হোসেন তার কোলে থাকা বাচ্চাটিকে যখন নষ্ট হয়ে যাওয়া দুধ ফিডার দিয়ে পান করাচ্ছিলেন সেই মুহুর্তে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মহিলা আবুল হোসেন সাথে আলাপচারিতায় জানতে পারে বিস্তারিত ঘটনা। সবকিছু শুনে নগরীর আলীগঞ্জ এলাকার তানিয়া ও তার খালা তাদের এক নিঃসন্তান আত্মীয়ের জন্য আবুল হোসেনর মা-হারা শিশু বাচ্চাটিকে দত্তক নেবার প্রস্তাব দেয়। পবা থানার অন্তর্গত ড্যাঙার হাট এলাকায় তানিয়ার এক খালা থাকেন। নাম মুঞ্জুরা বেগম। প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে মুঞ্জুরার বিয়ে হলেও এখনো পর্যন্ত তাদের সংসারে কোন শিশু জন্মগ্রহণ না করায় তারাও অনেকদিন ধরেই খুঁজতে ছিলেন একটি ছোট্ট শিশু বাচ্চা বলে জানান ঐস্থানে উপস্থিত থাকা তানিয়া ও তার এক খালা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আবুল হোসেনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ছোটমণি নিবাস কার্যালয়ে।

সেখানে কর্মরতরা তাকে জানান, বাবা জীবিত থাকাবস্থায় শিশুকে সেখানে নেবার কোন নিয়মনীতি নেই। সরকারি নিয়মানুযায়ী, ‘পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, ঠিকানাবিহীন ও বিপন্ন অবস্থা থেকে উদ্ধারকৃত শূণ্য থেকে সাত বছর পর্যন্ত শিশুদের সোনামণি নিবাসে নেওয়া হয়’ বলে জানান সেখানে উচ্চমান সহকারী শরিফুল ইসলাম। সেখানে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে ঐ দুই অচেনা মহিলাকে শিশু বাচ্চাটিকে দত্তক দিতে রাজি হয়ে যান আবুল হোসেন। কিন্তু বাইরে এসে তাদেরকে না পেয়ে সে ফোন করে তাদের। তারা প্রথমে বলেছিল, আমরা এখানে এসেছি ব্যাংকের কাজে। কিন্তু ফোন করার পরে তানিয়া বলেন, আমরা এখন জেলখানা গেটের সামনে। আপনি একটু দাঁড়ান আমরা আসতেছি।

নিজেদের পেশাগত দায়িত্বপালনকল্পে আমরা আবুল হোসেন কে সোনামনি নিবাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে চলে আসি এবং আসার পূর্বে তাকে বলে আসি, আপনি যদি সত্যি অচেনা ঐ দুই মহিলাকে আপনার সন্তানকে দত্তক দেন তবে, যে এলাকায় দিবেন সেখানকার চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ প্রশাসনের সামনে লিখিত আকারে সন্তান হস্তানতর করবেন। অবশেষে, গতকাল (ঐদিন সন্ধায়) সন্ধ্যার পরে আবুল হোসেন বিষয়টি সম্পর্কে জানার জন্য ফোন দিলে আবুল হোসেন বলেন, ‘ভাই আমার বাচ্চাটা জানে বেঁচে গেছে। আপনারা চলে যাবার কিছুক্ষণ পরেই তারা একজন ছেলেকে নিয়ে আমার কাছে এসে বাচ্চাটা নিতে চাইছিল। আমি আপনাদের কথা মতো নিয়ম কানুনের কথা বলাতে তারা রাজি হয় নি। তারা আমাকে কিছু টাকা দিয়ে ঐ মুহুর্তেই বাচ্চাটি নিয়ে চলে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

আমি আমার সন্তানকে তাদের হাতে দেই নাই। কোন উপায়ন্তর না দেখে ঐ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা তানিয়া ও তার এক খালার কাছে তাদের কথা মতো শিশু বাচ্চাটিকে আবুল হোসেন দিয়ে দিলে কি হতো সেটি অনুমেয় একটি বিষয়। হয়তো তাদের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল বিধায় তারা আইনের আওতায় না এসে অন্যপন্থায় শিশু বাচ্চাটিকে হাতিয়ে নেবার একটি ফন্দি আটছিল বলে মন্তব্য আবুল হোসেনের। আবুল হোসেন আরো জানায়, অর্থাভাবে এবং তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি তার আট বছরের মেয়েকে নগরীর শিশু পল্লীতে দিয়ে দেবেন।