এফএনএস : ২৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রায় ১৮ বছর পর মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিসিএস ক্যাডার (স্বাস্থ্য) হয়েছেন ডা. সুমনা সরকার। তার সরকারি চাকরির অবসরের বয়স আছে আর মাত্র ১১ বছর। জানা গেছে, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) থেকে গত বৃহস্পতিবার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ডা. সুমনা সরকারকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে ফল প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ২৩তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষা-২০০০ এর প্রার্থী ডা. সুমনা সরকারকে (রেজিস্ট্রেশন নম্বর-০০১৪৬৮) বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের সহকারী সার্জন পদে নিয়োগের জন্য সাময়িকভাবে সুপারিশ করা হলো।

প্রার্থীর আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত সনদ, তথ্য, ডকুমেন্টস এবং আবেদনপত্রে প্রার্থীর অঙ্গীরকারনামার ভিত্তিতে কমিশন কর্তৃক প্রার্থীকে এই শর্তে সাময়িকভাবে সুপারিশ করা হলো যে, নিয়োগের পূর্বে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রার্থীর সংযুক্ত সনদ, ডকুমেন্টস ও কাগজপত্রের সত্যতা যাচাইপূর্বক নিশ্চিত হয়ে চূড়ান্ত নিয়োগ দেবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে বা প্রাক চাকরি জীবন বৃত্তান্ত যাচাইয়ের পর চাকরির জন্য অযোগ্য বিবেচনা করা হলে ওই প্রার্থীর সুপারিশ বাতিল হবে। এর আগে চিকিৎসক সুমনা সরকার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ২৩তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সুমনা সরকারের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক অমল কৃষ্ণ সরকারের মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে জটিলতার অভিযোগে পিএসসি সুমনার মৌখিক পরীক্ষা নেয়নি।

তবে, সুমনা সরকার হাল ছাড়েননি। ২০০৯ সালে রিট করেন, সেই রিট নিষ্পত্তি করে ২০১৫ সালে হাইকোর্ট তার মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সেখানে উত্তীর্ণ হলে নিয়োগ দেওয়ার জন্যেও বলেন আদালত। ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে পিএসসি। এর পরে ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধানবিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে পিএসসিকে তার অসমাপ্ত মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের নির্দেশ দেন। উত্তীর্ণ হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়োগ দেওয়ার জন্যেও বলেছিলেন আদালত। ২০০০ সালে পিএসসির নেওয়া ২৩তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষায় স্বাস্থ্য ক্যাডারের প্রার্থী ছিলেন সুমনা। ওই বছরের মার্চে প্রিলিমিনারি এবং এপ্রিলে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০০৩ সালের জুনে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন।

মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে জটিলতার অভিযোগে সেই বছর চূড়ান্ত মৌখিক পরীক্ষা থেকে বাদ পড়েন তিনি। এর পরে ২০০৯ সালে সুমনা সরকার বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর মামলার রায় হয়। হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আপিল করে পিএসসি। আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে দেন। পরে গত বছরের ১৯ নভেম্বর আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি হলে পিএসসিকে অসমাপ্ত মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। ভাইভায় উত্তীর্ণ হলে তাকে বয়স অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে বলেছিলেন আদালত। তবে, তিনি যেহেতু সরকারের কোনো কাজ করেননি, তাই রায়ে বেতন-ভাতা নিয়ে কিছু বলা হয়নি।

চলতি বছরের ১ জুন সুমনা সরকার পিএসসির চেয়ারম্যান বরাবর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার জন্য আবেদন করেন। ৩০ জুন পিএসসি সচিবালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) নুর আহমদের সই করা চিঠিতে সুমনাকে জানানো হয়েছে, রায় বাস্তবায়নে সুমনার মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর সুবিধাজনক সময়ে ২৩তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডের আদলে সুমনার মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। তারই আলোকে ৭ অক্টোবর তার পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। টাঙ্গাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধা অমল কৃষ্ণ সরকার স্বাধীনতাযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আবদুল আহাদের স্বাক্ষরিত সনদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাময়িক সনদপত্র, মুক্তিবার্তার নম্বরসহ এই বীর মুক্তিযোদ্ধার সব সনদ ২০০৩ সালের ২১ জুন পিএসসির কাছে পাঠান সুমনা সরকার। এরপর সনদ জটিলতায় তার ভাইভা পরীক্ষা আটকে যায়। জানা গেছে সুমনা সরকারের, বিসিএস পরীক্ষার পর তার বড় ছেলের জন্ম হয়। ওই সময় তিনি রিট করার কথা চিন্তাও করেননি কিন্তু সে সময়ে অনেকে একসঙ্গে রিট করে সুবিচার পেয়েছিলেন। পরে একা একা আইনি লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ রায় পেতে পেতে তার সেই বড় ছেলেই এখন মেডিকেলের প্রথম বর্ষে পড়ছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মোতাহার হোসেন (সাজু) এবং তার স্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সেলিনা আক্তার চৌধুরী সুমনা সরকারের রিট মামলা পরিচালনা করেছিলেন। এত বছর পর রিট মামলার রায় পাওয়া বিষয়ে মো. মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বা তার সন্তান কখনোই মাথা নত করেন না, এ রায় তারই প্রমাণ। সুমনা সরকারের বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে কোনো দুর্বলতা ছিল না বলেই তিনি মাথা উঁচু করে আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। এ রায়ের ফলে ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের অবিচারের শিকার হবেন না বা সুমনা অন্যান্যের কাছে উদাহরণ হিসেবে থাকবেন।

আইনজীবী মো. মোতাহার হোসেন সুমনা সরকারের এ ঘটনায় পিএসসির দায় আছে বলে উল্লেখ করে বলেন, পিএসসি সুমনা সরকারের বাবার ‘প্রভিশনাল সনদ’ দিয়ে মৌখিক পরীক্ষা নিতে পারতো। তারা সেটা না করে পরীক্ষাতে অংশগ্রহণ করতে দেয়নি। সুমনা সরকারের সঙ্গে তখন যারা বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তারা এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত। এখন পিএসসি সুমনা সরকারের সঙ্গে কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।