শামীম রেজা : আজো চোখে পড়ে কাঠের ঘানিতে সরিষার তেল ভাঙ্গানো দৃশ্য। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে হারাতে বসেছে ঘানিতে তেল ভাঙ্গানোর কাজ। কাঠের ঘানির প্রধান যন্ত্র হচ্ছে একটা ষাঁড়। সহসায় কাঠের ঘানি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। গতকাল বুধবার রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ইসলাবাড়ি গ্রামে আরব আলী নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে চোখে পড়লো কাঠের ঘানি। ঘানির এক প্রান্তে ঘাড়ে নিয়ে ঘুরে ষাঁড়। তার দুচোখ কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকে। ঘানির অপর প্রান্তে ষাঁড়ের পেছনে ঘুরেন ঘানির মালিক আরব আলী। কেউ কেউ এটাকে ‘কলুর বলদ’ও বলে থাকেন। ষাঁড় আর মানুষের সম্মিলিত চেষ্টায় ঘানি থেকে বিন্দু বিন্দু তেল পড়ে বাটিতে।

আরব আলীর বয়স প্রায় ৬০ বছর। দীর্ঘ ২ যুগ ধরে তেলের জন্য আরব আলী এভাবে ষাঁড়ের সঙ্গে ঘানি টেনে চলেছেন। ঘানি থেকে বের হওয়া বিন্দু বিন্দু তেলেই চলে তাঁর জীবিকা ও সংসার। ছেলেকেও লেখাপড়া শিখিয়েছেন তিনি ঘানি টেনে। বাপের পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্য গরু দিয়ে ঘানি টেনে চলেছেন তিনি। আরব আলী জানালেন, তাঁর বাবা আফসার আলীও ঘানিতে তেল ভাঙ্গানোর কাজ করতেন। বয়সের কারণে তিনি আর ঘানির সঙ্গে ঘোরেন না। তবে তাঁর পেশাকে ধরে রেখেছেন তিনি। তাঁর গরু একটাই। গরুটি কাঠের ঘানির সাথে লাগানো গড়ায় বাঁধা থাকে।

দিনের বেলায় সেই গড়াতেই খায়। রাতে বাড়িতে উঠান। আরব আলীর এই কাজে সহযোগিতা করেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা ও কলেজে পড়ুয়া ছেলে। ঘানি টেনে বের করা বিন্দু বিন্দু তেল জমিয়ে বড় টিনের পাত্রে ঢেলে রাখেন। ঘানি থেকে বের হওয়া ওই তেলই ভবানীগঞ্জ বাজারে বিক্রি করেন। হেলাল উদ্দীন নামের এক শিক্ষক নিয়মিত ঘানিতে ভাঙ্গানো তেল কিনে থাকেন। অন্য তেলের চেয়ে দাম একটু বেশি হলেও খেতে অনেক সুস্বাদু। সেই সাথে ভেজালমুক্ত। লোকজনের চাহিদা অনযায়ী তেলের সরবরাহ কম।

আরব আলী জানান, বাজার থেকে সরিষা কিনে এনে তা কাঠের ঘানিতে দিয়ে তেল প্রস্তুত করতে হয়। পরে তা খাবার উপযোগী করে বাজারে বিক্রি করেন। ঘানি টেনে তেল বিক্রি করে সংসার চালান আরব আলী। ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। তার ছেলে ইয়ামিন আলী রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। ছেলেও এই ঘানি টানতে সহযোগিতা করেন বলে জানিয়েছেন। ছেলে ইয়ামিন আলী বলেন, বর্তমানে কাঠের ঘানি টেনে তেল তৈরি আর করা হয় না। অনেক যান্ত্রিক পদ্ধতি থাকলেও গরু দিয়ে ঘানি টেনে চলেছেন তাঁরা। আরব আলী জানান, প্রতিদিন ভোর থেকে গরু দিয়ে কাঠের ঘানি টানা শুরু করি। থেমে থেমে চলে বিকেল পর্যন্ত।

ঘানি আর গরুর সঙ্গে তাঁকেও ঘুরতে হয় তেল তৈরি করতে। এভাবে ঘানি টেনে দিন প্রায় ২০ কেজির অধিক সরিষা ভাঙ্গানো যায়। এ থেকে প্রায় ৭ লিটারের মতো তেল তৈরি করা সম্ভব হয়। একটি গরু হওয়ায় ঘানি টানালে গরুর ওপর চাপ বেশি পড়ে। গরু অসুস্থ হলে অনেক সময় তিনি নিজেই ঘানি টানেন। কষ্ট হলেও এই পেশাকে মেনে নিয়েছেন আরব আলী। বাড়িতে তৈরি কাঠের ঘানির তাঁর এই তেলের চাহিদাও রয়েছে। তিনি জানান, এলাকা ছাড়াও বিভিন্ন স্থানের লোকজন এসে তেল কিনে নিয়ে যান। এই পেশাকে ঐতিহ্য হিসেবে ধরে রেখেছেন। উপজেলা জুড়ে একমাত্র আরব আলীই কাঠের ঘানিতে তেল তৈরি করেন বলে জানা গেছে।