রবিবার

৩রা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

থামছেই না রাজশাহীর ফসলি জমি খেকোরা

Paris
Update : মঙ্গলবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০

জসিম উদ্দীন ও নুর কুতুবুল আলম : রাজশাহীতে উর্বর ফসলী জমি খেকোদের থামানোই যাচ্ছে না। রাজশাহীর বাগমারায় থেমে নেই অবৈধ পুকুর খনন। ফসলী জমিতে অবৈধ পুকুর খনন কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অতি মুনাফা লোভী প্রভাবশালীরা দিনে রাতে ম্যানেজনীতিতে পুকুর খনন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বল্প সময়ে খনন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে অত্যাধুনিক খনন যন্ত্র। উপজেলার গনিপুর ইউনিয়নের খালিমপুর বিলে প্রভাবশালী রিপন হাজী, আউচপাড়া ইউনিয়নে আচিনপুর মৌজায় মোস্তাক গং এবং ভবানীগঞ্জ পৌর এলাকায় দরগা মাড়িয়া মহল্লায় এরশাদুল হক, গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের দক্ষিণ সাঁজুড়িয়া-রামরামা মৌজায় আনোয়ার মাষ্টার গংরা পুকুর কেটে ফসলী জমি নষ্ট করে চলেছেন।

সূত্রে জানা গেছে আরও কয়েকটি বিলে বিশালাকৃতির পুকুর খননের প্রস্তুতি চলছে। প্রভাবশালীদের ভয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা মুখ খুলতে শাহস দেখান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, পুকুর খননের ফলে পুকুরের আশ পাশের লাখেরাজ সম্পত্তি অনাবাদি হয়ে পড়বে। ল’ইয়াস সোসাইটি ফর ল এর পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এ্যাডভোকেট জালাল উদ্দীন উজ্জল হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করলে, (রিট পিটিশন নং ৪৩৫৩/২০১৭) হাইকোর্টের মহামান্য বিচারপ্রতি নায়মা হায়দার এবং মহামান্য বিচারপ্রতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান, বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সহ সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।

এরশাদুল, মোস্তাক এবং রিপন হাজীর নিকট সরাসরি জানতে চাইলে পুকুর খননের বৈধ কোনো দলিল দস্তাবেজ তাঁরা দেখাতে সক্ষম হননি। ভবানীগঞ্জ পৌর এলাকার আবুল কালাম মন্ডল অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসানকে অবহিত করলে তিনি পুকুরের অবস্থান ম্যাসেজ আকারে চান। বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফ আহম্মেদ এর নিকট মুঠোফোনে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি পুকুরগুলোর অবস্থান সম্পর্কে সিএ শহিদুল ইসলামকে অবহিত করার পরামর্শ দেন।

এদিকে আমাদের মান্দা প্রতিনিধি জসিম উদ্দীন জানান, নওগাঁর মান্দায় ফসলি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুর খননের হিড়িক শুরু হয়েছে। পুকুর খনন করার পর তোলা মাটি বিক্রি করা হচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটায়। ভূমি আইন উপেক্ষা করে অবাধে পুকুর খনন করায় দিনদিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমির পরিমাণ। অন্যদিকে ইটভাটার চাহিদা মেটাতে দেদারচ্ছে বিক্রি হচ্ছে ফসলি জমির টপসয়েল। মাটিবহনকারী ট্রাক্টরের অবাধ চলাচলে নষ্ট হচ্ছে প্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্তা।

জানা গেছে, উপজেলার প্রসাদপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর, খুদিয়াডাঙ্গার খুলুর বিল, তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের সিংগা (টিটিহারী), গনেশপুর ইউনিয়নের ভেবড়া, ভালাইন ইউনিয়নের বনতসর, ভারশোঁ ইউনিয়নের ঠাকুরমান্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় পুকুর খননের হিড়িক পড়ে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমির মাটিও কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়। অন্যদিকে ফকিন্নি নদীর মোহনা সংলগ্ন এলাকায় সরকারি সম্পত্তির মাটি কেটেও বিক্রি করেছেন এলাকার কতিপয় অসাধু ব্যক্তি। উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে, মান্দা উপজেলায় কৃষি জমির পরিমাণ ২৭ হাজার ৮৫১ হেক্টর। এর মধ্যে তিন ফসলি জমি ১৭ হাজার ২১৮ হেক্টর, দুই ফসলি ৮ হাজার ১৮৫ হেক্টর ও এক ফসলি জমির পরিমাণ ২ হাজার ৩১১ হেক্টর।

স্থানীয়রা জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভূমি আইন উপেক্ষা করে ফসলি জমিতে পুকুর খনন করা হচ্ছে। অনেকে আবার বাগানের জমির মাটি কেটে সেখানে পুকুর খনন করছেন। এছাড়া আইনের তোয়াক্কা না করেই নদী সংলগ্ন বাঁধের মাটিও কেটে নিচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যক্তি। ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজস করে মাটি ব্যবসায়িরা সপ্তাহের বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত নির্বিগ্নে খনন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, কোনো কোনো এলাকায় এস্কেভেটর (ভেকুমেশিন) আবার কোনো এলাকায় শ্রমিক লাগিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টরের সাহায্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসব মাটি খননে কোন অনুমোদন নেয়া হয়নি।

জমির মালিককে অর্থের লোভ দেখিয়ে কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে টপসয়েল। দিনের বেলায় বন্ধ থাকলেও রাতের বেলায় চুটিয়ে চলছে খনন কাজ। এতে করে দিনদিন কমছে ফসলি জমির পরিমাণ। এভাবে চলতে থাকলে আগামিতে শস্যভান্ডারের উপাধি হারাবে এ উপজেলা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁর অতিরিক্ত উপপরিচালক গোলাম ফারুক হোসেন জানান, শিল্প কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন কারণে দেশে প্রতিবছর এমনিতেই ১% হারে ফসলি জমি কমে যাচ্ছে।

এছাড়া ফসলি জমির উপরিভাগের ৬ ইঞ্চি পরিমাণ মাটিতে জৈব পদার্থ থাকায় একে টপসয়েল বলা হয়ে থাকে। জমির এই অংশ কোনোভাবেই কেটে নেওয়া উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, কৃষি জমির টপসয়েল কেটে নেওয়া হলে ওই জমিতে আর কাঙ্খিত ফসল উৎপাদন হবে না। এতে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাবে।যারা কৃষি জমি কেটে নিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি। উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ইমরানুল হক বলেন, ইতোমধ্যে কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অবিলম্বে অবৈধ মাটি খননকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris