এফএনএস : দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম। ফলে চাহিদার বড় একটি অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। আর পেঁয়াজ আমদানি মূলত ভারতনির্ভর। ভারত রফতানি বন্ধ করে দিলে দেশের পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী চার বছরের মধ্যে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ে এক সভায় রোডম্যাপটি উপস্থাপন করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রোডম্যাপ অনুযায়ী এবার পেঁয়াজের ফলন ২ লাখ টন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হবে। পরের বছর (২০২১-২২) ৩ লাখ ২২ হাজার টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক লাখ টন পেঁয়াজ অতিরিক্ত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সব ঠিকঠাক হলে ৪ বছর পর এখনকার তুলনায় পেঁয়াজের উৎপাদন ১০ লাখ টন বেশি হবে। বর্তমানে হেক্টরপ্রতি পেঁয়াজের উৎপাদন ১০ লাখ টনের মতো। উচ্চ ফলনশীল বীজ পেলে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ লাখ টনে নিয়ে আসা সম্ভব। অন্যান্য দেশে তাই হচ্ছে। তাতে আবাদের জমি বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। সরকার সেদিকেই যাচ্ছে এবং বীজের ক্ষেত্রেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।


সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে পেঁয়াজ চাষের আওতায় জমির পরিমাণ ২ লাখ ৩৭ হাজার হেক্টর। ওসব জমিতে মোট ২৫ লাখ ৬৬ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। উৎপাদিত পেঁয়াজের মধ্যে রবি ৮১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, মুড়িকাটা ১৮ দশমিক ১৯ শতাংশ ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ০ দশমিক ১১ শতাংশ। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ১০ দশমিক ৮২ টন। কিন্তু দেশে ২৫ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হলেও তার মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পেঁয়াজের উৎপাদন ১৯ লাখ টনের মধ্যে থাকে। অথচ বীজ ও অপচয় বাদে দেশে মোট চাহিদা ২৫ লাখ ৯৬ হাজার টন। আর ২৫ শতাংশ সংগ্রহোত্তর ক্ষতি বিবেচনায় উৎপাদন দরকার ৩৪ লাখ ৬১ হাজার টন।

সে অনুযায়ী পেঁয়াজের ঘাটতি ৮ লাখ ৯৫ হাজার টন। প্রতি বছর মোটামুটি ১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। বিগত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯০ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি হয় ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৯২০ টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪০ টন এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৯১ হাজার টন। গত অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৭ হাজার ২২০ টন। আমদানি করা পেঁয়াজের প্রায় পুরোটাই ভারত থেকে এসেছে। আর চীন, মিশর, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে সামান্য পরিমাণ এসেছে। বিগত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৫ শতাংশ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শতভাগ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শতভাগ পেঁয়াজ ভারত থেকে এসেছে।

সূত্র আরো জানায়, চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) ২৫ লাখ ৯৬ হাজার টন নিট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৫ শতাংশ ক্ষতিসহ পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৪ লাখ ৬১ হাজার টন। উৎপাদনশীলতা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়বে ৬ লাখ ২৫ হাজার টন। আর ২ লাখ ৭০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হবে। পরের বছর (২০২০-২১) চাহিদা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ২৫ হাজার টন। ক্ষতিসহ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৮ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে চতুর্থ বছরে কোনো পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন হবে না। বরং পেঁয়াজ উদ্বৃত্ত থাকবে। পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন কৌশল নেয়া হবে। সেক্ষেত্রে উচ্চ ফলনশীল জাত এবং উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হবে। সেজন্য প্রচলিত জাতের তুলনায় হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বাড়ানো হবে। পেঁয়াজ চাষের এলাকা বাড়িয়ে বা ফসল প্রতিস্থাপন করে আবাদ সম্প্রসারণ করা হবে। ২০২০-২১ অর্থবছরে অনাবাদি এলাকা ও চরের জমি অন্তর্ভুক্ত করে সম্ভাব্য ১২ হাজার ১২ হেক্টর বর্ধিত জমি থেকে উৎপাদন বাড়ানো হবে। সেক্ষেত্রে সমন্বিত চাষাবাদ ও আন্তঃফসল চাষের উদ্যোগ নেয়া হবে।

আখ ও ভুট্টার সঙ্গে শীতকালীন পেঁয়াজ এবং আদা, হলুদ, কচুমুখীর সঙ্গে চাষ করা হবে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ। পাশাপাশি মুড়িকাটা পেঁয়াজ ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানো হবে। দেশব্যাপী এক লাখ কৃষককে প্রতি এক শতক জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ৩ টন বীজ বিতরণ করা হবে। কারণ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে পেঁয়াজের উন্নত জাতের বিকল্প নেই। তবে বারি পেঁয়াজ-৪, বারি পেঁয়াজ-৫, বারি পেঁয়াজ-৬, লাল তীর কিং— এসব উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ সহজলভ্য নয়। এগুলো কৃষক পর্যায়ে নিয়ে যেতে কয়েক বছর সময় লাগবে।

এদিকে বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজে পেঁয়াজ সংরক্ষণের মাধ্যমে সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমিয়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। বর্তমানে পেঁয়াজের যে সংরক্ষণ ব্যবস্থা তা সনাতন এবং মোটেও বিজ্ঞানসম্মত নয়। ব্যাপক ক্ষতির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পেঁয়াজকে হয় ঘরের চিলেকোঠায়, না হয় মাটির মেঝেতে বিছিয়ে অথবা পাটের বস্তায় মার্চ থেকে নবেম্বর অর্থাৎ চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণের প্রাণান্তর চেষ্টা করা হয়। এমন অবস্থায় পেঁয়াজের জাত বা জিনোটাইপ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা উপযুক্ত না হওয়ায় ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। তাতে সংরক্ষণকালীন শরীরতাত্ত্বিক কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে ওজন কমে যায় (যেমন- আর্দ্রতা কমে পেঁয়াজ সংকুচিত হয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, পচনে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং অসময়ে অঙ্কুরিত হয়ে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়)।

বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসে যখন অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিরাজ করে তখন পেঁয়াজ বেশি নষ্ট হয়। সেজন্য রোডম্যাপ অনুযায়ী বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজে পেঁয়াজ সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেয়া হবে। তাছাড়া ক্ষতি কমাতে কৃষকদের প্রশিক্ষণও দেয়া হবে। অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আসাদুল্লাহ জানান, আগামী চার বছরের মধ্যে দেশ পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পেঁয়াজের যে ক্ষতি হয় তা কমিয়ে আনা হবে। রোডম্যাপের অংশ হিসেবে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আনতে বিভিন্ন কৌশল নেয়া হবে। চাষিদের পেঁয়াজ সংরক্ষণের বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। দেশে হাইটেক পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে কৃষি সচিব মেসবাহুল ইসলাম জানান, পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেটি এখনো চূড়ান্ত করা যায়নি। তবে এ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সরকার চার বছরের মধ্যে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চাচ্ছে।