মোবারক হোসেন শিশির : রাজশাহীর দুর্গাপুরে অবৈধভাবে গড়ে উঠছে প্রায় ১৬টি যৌন চিকিৎসালয়। অনুমোদনহীন এসব কবিরাজি চিকিৎসালয়ে চলছে অনিয়ম আর প্রতারণা। অভিযোগ রযেছে অনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও। কথিত কবিরাজরা জোরেশোরেই চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের এ রমরমা ব্যবসা। গত (১১নভেম্বর) নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার দাস গ্রামের স্বপন নামের এক যুবক যৌন চিকিৎসা নিতে এসে কবিরাজের চিকিৎসালয়েই আত্মহত্যা করেন। এর আগে পাবনা জেলা থেকে স্বামী-স্ত্রী চিকিৎসা নিতে এসে চিকিৎসালয়ের ম্যানেজার কতৃর্ক রোগীর স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় থানায় ধর্ষনের মামলার পর কথিত কবিরাজ ও তাঁর ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এছাড়াও একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে কয়েকটি কবিরাজ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা, কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর পরও থামেনি তাদের এই অবৈধ কর্মকাণ্ড।

জানা গেছে, উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের হাটকানপাড়া, গুলালপাড়া, বাজুখলসী, ক্ষিদ্রখলসী ও তেঘরিয়া গ্রামে সবচেয়ে বেশি অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে যৌন চিকিৎসা কেন্দ্র। এসব চিকিৎসালয়ের একটিরও অনুমোদন নেই। কুমিল্লা, ফেনী, পাবনা, নওগাঁ, চাপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নাটোর সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে যৌন চিকিৎসা নিতে আসেন রোগীরা। অন্তত ১৬টি কবিরাজ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নামে তাদের এই অবৈধ কারবার চালিয়ে যাচ্ছে নিশ্চিন্তে। অভিযোগ আছে, কবিরাজি চিকিৎসার নামে এরা যৌন উত্তেজক মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। মূলত যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট গুড়ো করে হালুয়া বানিয়ে হারবাল ওষুধ হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে।

কবিরাজ প্রতিষ্ঠানের মালিক চিকিৎসকরা রোগীদের আকৃষ্ট করতে নিজেরাই ওষুধের নাম তৈরি করে। বাহারি কায়দার নাম দেখে রোগীরা আকৃষ্ট হয়ে প্রতারণার কবলে পড়ছে। দীর্ঘ দিনধরে নেই কোন অভিযান, ফলে নির্বিগ্নে চলছে তাদের তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড। দুর্গাপুর থানার তথ্য মতে কবিরাজের তালিকায় রয়েছেন, উপজেলার বাজুখলসী গ্রামের বাবু, মোতালেব, বাচ্চু, মামুন, আবুল কালাম, কানপাড়া গ্রামের আনছার আলী, নাসির উদ্দিন, তেঘরিয়া এলাকার মনোয়ার, ইসরাফিল, ক্ষিদ্রখলসী গ্রামের আশরাফ আলী, নাসির উদ্দিন, ভোগা ও বখতিয়াপুর গ্রামের আসলাম উদ্দিন। তবে ওই এলাকায় এই তালিকার বাইরে আরো অসংখ্য কবিরাজি চিকিৎসালয় আছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান, যৌন চিকিৎসার নামে সেফ প্রতারনা করছে এইসব কবিরাজি চিকিৎসক ব্যবসায়ীরা। কবিরাজরা নিজ বাড়িতেই যৌন চিকিৎসালয় গড়ে তোলেছেন। এজন্য প্রতিটি বাড়িতে রোগী, রোগীর থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ওই সব যৌন চিকিৎসালয়ে রোগী আসলে প্রথমে করিবাজের সাথে মোটা অংকের টাকার চুক্তিবদ্ধ হতে হয়। এরপর চিকিৎসার আগে রোগীকে অর্ধেক টাকা পরিশোধ করতে হয়। ফার্মেসী থেকে বিভিন্ন যৌন উত্তেজক ওষুধ কিনে নিয়ে তাদের মতো করে অন্যান্য মেডিসিনের সাথে মিশিয়ে বড়ি আর হালুয়া তৈরি করে। প্রকৃত হারবাল চিকিৎসার জনপ্রিয়তাকে পূঁজি করে এ চক্র ব্যবসা ফেঁদে বসেছে আসলে এরা এক ধরনের প্রতারক চক্র। এদের মূল ধান্দা টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়া। রোগীকে বিভিন্ন খাদ্যর সাথে যৌন উত্তেজক ওষুধ সেবন করে।

এরপর ওই রোগীকে পরীক্ষা করানো হয়। যৌন উত্তেজক ওষুধ খাইয়ে পরীক্ষা ফল ভাল আসার পর তারা রোগীদের থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। এর পর বাড়িতে গিয়ে ওষুধ বন্ধ করে দিলে আবারও আগের মত হয়ে যায়। এভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা প্রতারানার শিকার হয়। তারা আরও বলেন, কুমিল্লা, ফেনী, পাবনা, নওগাঁ, চাপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন আসে। এর মধ্যে উচ্চ বিত্তরাও রয়েছে। বখতিয়াপুর গ্রামের কবিরাজ আসলাম আলী বলেন, আমাদের ওস্তাদের কাছে কাজ শেখা। আমাদের কারো অনুমোদন নেই। পেটের দায়ে কবিরাজী করি। আমরা শুধু মাত্র যৌন রোগের চিকিৎসা করি। রোগ ভাল হয় বিধায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমাদের কাছে রোগীরা আসেন। আমরা রোগীকে কোন প্রকার উত্তেজক ওষুধ সেবন করি না। আমাদের চিকিৎসা গাছগাছড়া দিয়ে।

দুর্গাপুর থানার ওসি হাশমত আলী জানান, আমি যোগদানের পর শুনেছি ওই এলাকায় অসংখ্য কবিরাজী চিকিৎসালয় রয়েছে। কিছু দিন আগে এক কবিরাজী চিকিৎসালয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। লাশ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এখনো হাত পাওয়া যায়নি। রিপোর্ট হাতে পেলেই পরবর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওসি আরও বলেন, ওই সব এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা কবিরাজী চিকিৎসালয়ের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহসীন মৃধা জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিক্লপনা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার জন্য বলা হবে। সরকারী অনুমোদন ছাড়া মেডিকেল সায়েন্স এ ধরনের চিকিৎসা অবৈধ। বিষয়টা খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।